ক্যাটাগরি অর্থ বাজার

  • বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপেন মার্কেট অপারেশনস (OMO) নির্দেশিকা

    দেশের মুদ্রা বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার তারল্য ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘Guidelines for Open Market Operations’ বা ওপেন মার্কেট অপারেশনস (OMO) নির্দেশিকা জারি করেছে। ২০২৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তারিখে ডিএমডি সার্কুলার নং-০২ এর মাধ্যমে এই নির্দেশিকাটি প্রকাশ করা হয় এবং এটি ২০২৬ সালের ০৩ মে তারিখ হতে কার্যকর হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট (DMD) এই নীতিমালের তদারকি ও পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত। এই ব্লগে আমরা এই নির্দেশিকার মূল দিকগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।

    ওপেন মার্কেট অপারেশনস এর মূল উদ্দেশ্য

    বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রণীত এই নির্দেশিকার মূল লক্ষ্য হলো ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোকে স্বল্পমেয়াদী তারল্য সহায়তা প্রদান করা এবং বাজার থেকে অতিরিক্ত তারল্য উত্তোলন প্রক্রিয়াকে স্পষ্ট করা। আধুনিক ও সমন্বিত কাঠামোর আওতায় এই কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে সামগ্রিক মুদ্রানীতি বাস্তবায়নকে সহজতর ও সুসংহত করাই এর প্রধান উদ্দেশ্য। এটি মূলত বাজারে অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ এবং সুদের হারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।

    গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞাসমূহ

    নির্দেশিকাটি সঠিকভাবে বোঝার জন্য কিছু মূল শব্দ বা সংজ্ঞার ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি:

    • ওপেন মার্কেট অপারেশন (OMO): এটি মুদ্রানীতি বাস্তবায়নের এমন একটি মাধ্যম যার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে। এর প্রধান সরঞ্জামগুলোর মধ্যে রয়েছে রেপো, স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি, স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি এবং বাংলাদেশ ব্যাংক বিল।
    • রিপারচেজ অ্যাগ্রিমেন্ট (Repo): এটি একটি স্বল্পমেয়াদী ব্যবস্থা যেখানে ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তাদের কাছে থাকা ট্রেজারি বিল বা বন্ড বিক্রির মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করে এবং ভবিষ্যতে একটি নির্দিষ্ট তারিখে তা পুনরায় কেনার প্রতিশ্রুতি দেয়।
    • স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (SLF): ব্যাংকগুলোর যখন হঠাৎ অর্থের প্রয়োজন হয়, তখন তারা জামানতের বিপরীতে ওভারনাইট বা এক রাতের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যে ঋণ নেয়, তাকে SLF বলা হয়।
    • স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (SDF): ব্যাংকগুলোর কাছে যদি অতিরিক্ত অলস টাকা থাকে, তবে তারা কোনো জামানত ছাড়াই নির্দিষ্ট সুদে বাংলাদেশ ব্যাংকে সেই টাকা জমা রাখতে পারে।
    • বাংলাদেশ ব্যাংক বিল (BB Bill): বাজার থেকে অতিরিক্ত তারল্য দীর্ঘমেয়াদে তুলে নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এই বিল ইস্যু করে। এটি মূলত একটি স্বল্পমেয়াদী ঋণপত্র।
    • ইসলামিক ব্যাংকস লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটি (IBLF): এটি শরীয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকগুলোর জন্য তৈরি একটি ব্যবস্থা যা মুদারাবাহ চুক্তির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।

    প্রথাগত ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানির জন্য OMO সরঞ্জামসমূহ

    বাংলাদেশ ব্যাংক প্রচলিত ব্যাংকগুলোর জন্য মূলত চারটি প্রধান হাতিয়ার ব্যবহার করে তারল্য নিয়ন্ত্রণ করে।

    ১. রিপারচেজ অ্যাগ্রিমেন্ট (Repo)

    রেপো হলো বাজারে অর্থ সরবরাহের অন্যতম প্রধান মাধ্যম।

    • মেয়াদ: এটি সাধারণত ১ দিন (ওভারনাইট) এবং ৭ দিন মেয়াদী হয়।
    • সময়সূচী: ৭ দিনের রেপো অপারেশনটি নিয়মিতভাবে প্রতি মঙ্গলবার পরিচালিত হয়। তবে সিআরআর (CRR) সংরক্ষণের শেষ দিনে যদি কোনো নিয়মিত রেপো না থাকে, তবে ব্যাংকগুলোর সুবিধার্থে ১ দিনের রেপো আয়োজন করা হতে পারে।
    • সুদের হার: মুদ্রানীতি কমিটি (MPC) কর্তৃক সময়ে সময়ে নির্ধারিত ‘পলিসি রেট’ অনুযায়ী রেপোর সুদের হার নির্ধারিত হয়।

    ২. স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (SLF)

    এটি ব্যাংকগুলোর জন্য একটি আপদকালীন ব্যবস্থা।

    • মেয়াদ: এটি শুধুমাত্র ১ দিন বা ওভারনাইট মেয়াদী হয়।
    • সময়সূচী: প্রতিটি কার্যদিবসেই ব্যাংকগুলো এই সুবিধা গ্রহণ করতে পারে।
    • সুদের হার: এটি পলিসি রেটের একটি নির্দিষ্ট করিডোর অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।

    ৩. স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (SDF)

    যখন বাজারে টাকার প্রবাহ অনেক বেড়ে যায়, তখন মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এটি ব্যবহার করা হয়। এটিও ওভারনাইট মেয়াদী এবং প্রতিটি কার্যদিবসে ব্যাংকগুলো তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ এখানে জমা রাখতে পারে। এতে ব্যাংকগুলোকে কোনো সিকিউরিটিজ বা জামানত দেওয়া হয় না।

    ৪. বাংলাদেশ ব্যাংক বিল (BB Bill)

    বাজারের কাঠামোগত তারল্য শোষণের জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকর।

    • মেয়াদ: সাধারণ মুদ্রা অপারেশনের জন্য ৭ দিন এবং কাঠামোগত অপারেশনের জন্য ১৪, ৩০, ৯০ ও ১৮০ দিন মেয়াদী বিল ইস্যু করা হয়।
    • নিলাম পদ্ধতি: এই বিলগুলো নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হয় এবং এর ডিসকাউন্ট রেট পলিসি রেটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়।

    শরীয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকগুলোর জন্য তারল্য সুবিধা (IBLF)

    ইসলামিক ব্যাংকগুলোর জন্য সুদমুক্ত এবং শরীয়াহ সম্মত তারল্য ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে ‘ইসলামী ব্যাংকস লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটি (আইবিএলএফ)’ চালু করা হয়েছে। এটি মুদারাবাহ চুক্তির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক বিনিয়োগকারী বা ‘রাব্বুল মাল’ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকটি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপক বা ‘মুদারিব’ হিসেবে কাজ করে।

    • মেয়াদ ও মুনাফা: এটি সাধারণত ৭ দিন মেয়াদী হয়। এর মুনাফার হার সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের এক মাস মেয়াদী মুদারাবাহ টার্ম ডিপোজিট রিসিপ্ট (MTDR) এর হারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারণ করা হয়।
    • মুনাফা সমন্বয়: বছর শেষে ব্যাংকটির প্রকৃত অর্জিত মুনাফার ভিত্তিতে এই সাময়িকভাবে নির্ধারিত মুনাফা হার চূড়ান্তভাবে সমন্বয় করা হয়।

    রেপো এবং আইবিএলএফ এর মধ্যে পার্থক্য কী?


    বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশিকা অনুযায়ী, রেপো (Repo) এবং আইবিএলএফ (IBLF) উভয়ই বাজারে তারল্য সরবরাহের সরঞ্জাম হলেও এদের মধ্যে মৌলিক কিছু পার্থক্য রয়েছে। নিচে এদের প্রধান পার্থক্যগুলো তুলে ধরা হলো:

    ১. ব্যাংকিং ব্যবস্থার ধরন:

    • রেপো: এটি মূলত কনভেনশনাল বা প্রথাগত ব্যাংক এবং ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনার জন্য ব্যবহৃত হয় ।
    • আইবিএলএফ: এটি শরীয়াহ ভিত্তিক ব্যাংক এবং ফাইন্যান্স কোম্পানি (অথবা প্রথাগত ব্যাংকের ইসলামিক উইন্ডো) গুলোর জন্য তৈরি একটি শরীয়াহ সম্মত ব্যবস্থা ।

    ২. চুক্তির ভিত্তি:

    • রেপো: এটি একটি বিক্রয় এবং পুনরায় কেনার (Sale and Repurchase) চুক্তি, যা অর্থনৈতিকভাবে একটি জামানতযুক্ত অর্থায়ন হিসেবে বিবেচিত হয় ।
    • আইবিএলএফ: এটি মুদারাবাহ (Mudarabah) চুক্তির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক বিনিয়োগকারী (রাব্বুল মাল) এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বিনিয়োগ ব্যবস্থাপক (মুদারিব) হিসেবে কাজ করে ।

    ৩. রিটার্ন বা আয়ের প্রকৃতি:

    • রেপো: এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংককে সুদ (Interest) প্রদান করে, যা মুদ্রানীতি কমিটি (MPC) কর্তৃক নির্ধারিত পলিসি রেট অনুযায়ী হয় ।
    • আইবিএলএফ: এতে সুদের পরিবর্তে মুনাফা (Profit) বণ্টন করা হয়। এই মুনাফা একটি পূর্ব-নির্ধারিত মুনাফা বণ্টন অনুপাত (PSR) এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মুদারাবাহ টার্ম ডিপোজিট রিসিপ্ট (MTDR) হারের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয় ।

    ৪. জামানত (Collateral):

    • রেপো: এর বিপরীতে ট্রেজারি বিল, ট্রেজারি বন্ড এবং বাংলাদেশ ব্যাংক বিল জামানত হিসেবে রাখা হয়।
    • আইবিএলএফ: এর বিপরীতে জামানত হিসেবে বাংলাদেশ গভর্মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট সুকুক (BGIS) রাখা হয় ।

    ৫. মেয়াদ (Tenor):

    • রেপো: এর মেয়াদ সাধারণত ১ দিন (ওভারনাইট) এবং ৭ দিন হয়ে থাকে ।
    • আইবিএলএফ: এর মেয়াদ সাধারণত ৭ দিন হয় ।

    ৬. জরিমানার ব্যবহার:

    • রেপো: কোনো ব্যাংক খেলাপ করলে যে জরিমানা আদায় করা হয়, তা বাংলাদেশ ব্যাংকের আয় হিসেবে গণ্য হতে পারে।
    • আইবিএলএফ: শরীয়াহ নীতি অনুযায়ী, খেলাপী ব্যাংকের কাছ থেকে আদায়কৃত জরিমানার অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের আয় হিসেবে যোগ হয় না; বরং তা একটি চ্যারিটি ফান্ডে (বাংলাদেশ ব্যাংক ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি ফান্ড) স্থানান্তর করা হয় ।

    পরিচালন ও সেটেলমেন্ট পদ্ধতি

    OMO কার্যক্রম সাধারণত ইলেকট্রনিক সিস্টেম বা ফিন্যান্সিয়াল মার্কেট ইনফ্রাস্ট্রাকচার (FMI) এর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এর পুরো প্রক্রিয়াটি দুটি ধাপে সম্পন্ন হয়:

    প্রথম লেগ সেটেলমেন্ট (First Leg Settlement): লেনদেনটি সম্পন্ন হওয়ার পর প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কারেন্ট অ্যাকাউন্টে অর্থ জমা দেয় (রেপো বা SLF এর ক্ষেত্রে)। বিনিময়ে ব্যাংকের সিকিউরিটিজগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুকূলে জামানত হিসেবে লিয়েন করা হয়। এই সেটেলমেন্ট ভ্যালু নির্ধারণের সময় সিকিউরিটিজের বাজার মূল্য থেকে একটি নির্দিষ্ট অংশ ‘হেয়ারকাট’ হিসেবে বাদ দেওয়া হয়।

    দ্বিতীয় লেগ সেটেলমেন্ট (Second Leg Settlement): এটি হলো লেনদেনের মেয়াদ শেষ হওয়ার দিন। এই দিনে ব্যাংকটি সুদাসলসহ অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংককে ফেরত দেয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের জামানতকৃত সিকিউরিটিজগুলো মুক্ত করে দেয়।


    জামানত ও হেয়ারকাট (Haircut) নীতি

    OMO কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য ব্যাংকগুলোকে অবশ্যই যোগ্য সিকিউরিটিজ জামানত হিসেবে প্রদান করতে হয়।

    • যোগ্য সিকিউরিটিজ: ট্রেজারি বিল, ট্রেজারি বন্ড এবং বাংলাদেশ ব্যাংক বিলকে যোগ্য জামানত হিসেবে ধরা হয়। ইসলামিক ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ গভর্মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট সুকুক (BGIS) গ্রহণযোগ্য।
    • হেয়ারকাট: সিকিউরিটিজের বাজার ঝুঁকি মোকাবিলায় এর মূল্যের ওপর ৫% হেয়ারকাট প্রয়োগ করা হয়। অর্থাৎ, ১০০ টাকার সিকিউরিটিজের বিপরীতে ব্যাংক সর্বোচ্চ ৯৫ টাকা ঋণ পেতে পারে।

    চুক্তি লঙ্ঘন বা ডিফল্ট হওয়ার পরিণাম

    যদি কোনো ব্যাংক নির্দিষ্ট মেয়াদে অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হয়, তবে নির্দেশিকা অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক নিম্নলিখিত কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে:

    ১. বাংলাদেশ ব্যাংক তাৎক্ষণিকভাবে জামানতকৃত সিকিউরিটিজ বাজেয়াপ্ত ও বিক্রি করে নিজের পাওনা আদায় করতে পারে।

    ২. পাওনা আদায়ে কোনো ঘাটতি থাকলে তা ব্যাংকের কারেন্ট অ্যাকাউন্ট থেকে কেটে নেওয়া হয়।

    ৩. খেলাপি ব্যাংককে পুনরায় কোনো সুবিধা দেওয়ার আগে সকল বকেয়া পরিশোধ করতে হয়।

    ৪. জরিমানার ক্ষেত্রে রেপো বা SLF হারের সমপরিমাণ অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করা হয়। ইসলামিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে জরিমানার টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব আয় হিসেবে গণ্য না হয়ে একটি চ্যারিটি ফান্ডে জমা দেওয়া হয়।


    হিসাবরক্ষণ বা অ্যাকাউন্টিং পদ্ধতি

    নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, রেপো লেনদেনকে সিকিউরিটিজ কেনাবেচা হিসেবে না দেখে ‘জামানতযুক্ত ঋণ’ বা Collateralized Borrowing হিসেবে গণ্য করা হয়।

    • সিকিউরিটিজগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ব্যালেন্স শিটেই থাকবে তবে সেগুলোকে ‘দায়বদ্ধ’ বা Encumbered হিসেবে দেখাতে হবে।
    • মেয়াদ চলাকালীন এই সিকিউরিটিজগুলো এসএলআর (SLR) সংরক্ষণের জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবে না।
    • সিকিউরিটিজের বিপরীতে প্রাপ্ত কুপন বা মুনাফা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকই পাবে।

    সাধারণ শর্তাবলী ও সময়সূচী

    • সময়: রেপো এবং IBLF এর আবেদনের জন্য সকাল ১০টা থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত সময় নির্ধারিত। ফলাফল প্রকাশ করা হয় বিকেল ৩:৩০ মিনিটে।
    • সেটেলমেন্ট: সকল লেনদেন T+0 ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়, অর্থাৎ আবেদনের দিনেই টাকা পাওয়া যায়।
    • ছুটির দিন: যদি মেয়াদ শেষের দিন সরকারি ছুটি থাকে, তবে পরবর্তী কার্যদিবসে লেনদেন সম্পন্ন হবে এবং ঐ অতিরিক্ত দিনের সুদ প্রদান করতে হবে।
    • ম্যানুয়াল আবেদন: যদি ইলেকট্রনিক সিস্টেমে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়, তবে বিশেষ ফরমে ম্যানুয়াল আবেদন জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

    ডেডলাইন:

    আগামী ০৩ মে, ২০২৬ থেকে এটি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হবে

    উপসংহার

    বাংলাদেশ ব্যাংকের এই বিস্তৃত OMO নির্দেশিকা দেশের ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও শৃঙখলা নিশ্চিত করার একটি বড় পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে যেমন ব্যাংকগুলো তাদের সাময়িক অর্থের সংকট মেটাতে পারে, তেমনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকও বাজারের তারল্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখে মুদ্রাস্ফীতি ও সুদের হারের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সক্ষম হয়। প্রথাগত এবং শরীয়াহ ভিত্তিক উভয় পদ্ধতির জন্য সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন থাকায় দেশের সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা আরও মজবুত হবে বলে আশা করা যায়।

  • বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৪তম গভর্নর মোঃ মোস্তাকুর রহমান: পরিচয় ও প্রেক্ষাপট

    বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে এক সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জনাব মোঃ মোস্তাকুর রহমান এফসিএমএ-কে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৪তম গভর্নর হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। তিনি ২৬শে ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৪তম গভর্নর হিসেবে যোগদান করেন।

    দীর্ঘ ৩৩ বছরেরও বেশি সময়ের পেশাদার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন ‘কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট’ (CMA)-এর হাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব অর্পণ আর্থিক খাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

    তিনি পেশায় ব্যবসায়ী। তিনি হেরা সোয়েটার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। হেরা সোয়েটার্স নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত একটি পরিবেশবান্ধব কারখানা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়া হলো।

    পরিচয়

    জন্ম ও শিক্ষাগত পটভূমি

    মোঃ মোস্তাকুর রহমান ১৯৬৬ সালের ১২ মে সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৮৪ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন।

    তার শিক্ষার ভিত্তি গড়ে উঠেছে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে অত্যন্ত সফলতার সাথে বি.কম (সম্মান) এবং স্নাতকোত্তর (Masters) ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৯২ সালে পেশাদার ডিগ্রি হিসেবে FCMA (Fellow Cost and Management Accountant) অর্জন করেন, যা তাকে একজন উচ্চপদস্থ আর্থিক বিশেষজ্ঞ হিসেবে বৈশ্বিক পরিচিতি এনে দেয়।

    পেশাগত যোগ্যতা

    এই নিয়োগের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো তার নামের সাথে যুক্ত এফসিএমএ (FCMA) উপাধি। তিনি একজন ফেলো কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট (Fellow Cost and Management Accountant)।

    • আর্থিক দক্ষতা: একজন এফসিএমএ হিসেবে তার রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয় ব্যবস্থাপনা, আর্থিক পরিকল্পনা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা।
    • নতুন দৃষ্টিভঙ্গি: সাধারণত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে অর্থনীতিবিদ বা আমলাদের দেখা গেলেও, একজন প্রফেশনাল অ্যাকাউন্ট্যান্টের অন্তর্ভুক্তি ব্যাংকিং খাতের অডিট, মনিটরিং এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

    তিন দশকের সমৃদ্ধ কর্মজীবন

    জনাব মোস্তাকুর রহমানের রয়েছে ৩৩ বছরেরও বেশি সময়ের পোস্ট-কোয়ালিফিকেশন অভিজ্ঞতা। তিনি কেবল একজন তাত্ত্বিক অর্থনীতিবিদ নন, বরং সরাসরি শিল্প ও ব্যবসার নাড়ি নক্ষত্র বোঝা একজন সফল উদ্যোক্তা এবং প্রশাসক।

    প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব: গভর্নর হওয়ার আগে তিনি রপ্তানিমুখী বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান ‘হেরা সোয়েটার্স লিমিটেড’ (Hera Sweaters Limited)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (MD) এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

    শিল্প ও বাণিজ্যে অবদান: তিনি দীর্ঘকাল ধরে বিজিএমইএ (BGMEA), রিহ্যাব (REHAB), ঢাকা চেম্বার অফ কমার্স (DCCI) এবং আটাব (ATAB)-এর মতো প্রভাবশালী বাণিজ্য সংগঠনের সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন।

    স্টক এক্সচেঞ্জ ও নীতিনির্ধারণ: ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (CSE)-এর বোর্ড সদস্য ছিলেন। এছাড়াও তিনি বিজিএমইএ-র ‘স্ট্যান্ডিং কমিটি অন বাংলাদেশ ব্যাংক’-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালার সাথে তার গভীর সংযোগের পরিচয় দেয়।

    চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ব্যাংক সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি – বিজিএমইএ

    চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের প্রাক্তন বোর্ড সদস্য (১৯৯৮-২০০০)

    সদস্য, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)

    সদস্য, রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ (রিহ্যাব)

    মূল দক্ষতা

    সততা, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার জন্য তিনি সুপরিচিত। প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয়ে তার দৃঢ় অঙ্গীকার রয়েছে। তার অভিজ্ঞতার প্রধান ক্ষেত্রগুলো হলো—

    • আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন
    • ব্যাংকিং ও শিল্প অর্থায়ন
    • রপ্তানি অর্থায়ন ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা
    • প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকি তদারকি
    • কর্পোরেট ও নিয়ন্ত্রক নীতিমালা অনুসরণ
    • মূলধন কাঠামো ও তারল্য ব্যবস্থাপনা
    • বোর্ড পরিচালনা ও নৈতিক দায়িত্ব
    • কৌশলগত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা
    • আর্থিক প্রতিবেদন ও জবাবদিহিতা
    • স্টেকহোল্ডার সম্পৃক্ততা ও নীতিনির্ধারণী সংলাপ
    • টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণ

    বিশেষ দক্ষতা ও সক্ষমতা

    একজন সিনিয়র ফিন্যান্সিয়াল গভর্ন্যান্স স্পেশালিস্ট হিসেবে তার দক্ষতার ক্ষেত্রগুলো অত্যন্ত বিস্তৃত:

    • আর্থিক সুশাসন: কর্পোরেট ফিন্যান্স, এক্সপোর্ট ইকোনমিক্স এবং প্রাতিষ্ঠানিক গভর্ন্যান্স কাঠামো নির্মাণে তার রয়েছে ৩০ বছরেরও বেশি নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা।
    • ব্যাংকিং ও শিল্প অর্থায়ন: শিল্পে অর্থায়ন, মূলধন কাঠামো ব্যবস্থাপনা এবং লিকুইডিটি বা তারল্য ব্যবস্থাপনায় তিনি একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃত।
    • আইনি ও নীতিগত জ্ঞান: বাংলাদেশ ব্যাংকের রেগুলেটরি কমপ্লায়েন্স এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে নীতিনির্ধারকদের সাথে কাজ করেছেন।

    ফেলো সদস্য, ইনস্টিটিউট অফ কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অফ বাংলাদেশ

    পরামর্শমূলক ও বিশ্লেষণধর্মী সম্পৃক্ততা

    • জাতীয় পর্যায়ের আর্থিক তথ্য বিশ্লেষণ ও কাঠামোবদ্ধ প্রতিবেদন প্রস্তুত
    • প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনসংক্রান্ত নথি প্রণয়নে পরামর্শ প্রদান
    • জবাবদিহিতা কাঠামো উন্নয়নে অবদান
    • শিল্পখাত-সংশ্লিষ্ট ম্যাক্রো-ফাইন্যান্স আলোচনায় বিশ্লেষণধর্মী অংশগ্রহণ

    সমাজসেবা ও মানবিক দিক

    পেশাদারিত্বের বাইরেও মোঃ মোস্তাকুর রহমান একজন নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবক। তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন:

    • প্যালিয়েটিভ কেয়ার: দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সেবায় তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
    • শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা এবং অসহায় মানুষের চিকিৎসা সহায়তায় তার অংশগ্রহণ তাকে একজন সংবেদনশীল ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
    • বিভিন্ন দাতব্য ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ

    নিয়োগের শর্ত ও সময়কাল

    ২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি জারিকৃত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, তিনি যোগদানের তারিখ থেকে পরবর্তী ৪ বছরের জন্য এই পদে আসীন থাকবেন। নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী, তিনি অন্য সকল ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানের সাথে তার বিদ্যমান কর্ম-সম্পর্ক ত্যাগ করবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২-এর ১০(৫) ধারা অনুযায়ী তাকে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

    প্রেক্ষাপট

    আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে মো. মোস্তাকুর রহমানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। আজ অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের পৃথক প্রজ্ঞাপনে সরকারের এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়।

    একটি প্রজ্ঞাপনে গভর্নর পদে আহসান এইচ মনসুরের নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করার কথা জানিয়ে বলা হয়, জনস্বার্থে জারি করা এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।

    আরেকটি প্রজ্ঞাপনে নতুন গভর্নর নিয়োগের সিদ্ধান্ত জানিয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ অনুযায়ী মো. মোস্তাকুর রহমানকে অন্য সব প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে কর্ম–সম্পর্ক পরিত্যাগের শর্তে তাঁর যোগদানের তারিখ থেকে ৪ (চার) বছরের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ প্রদান করা হলো। জনস্বার্থে জারি করা এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে।

    কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তন নিয়ে দুপুরে সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘নতুন সরকারের অনেক কর্মসূচি এবং অগ্রাধিকার আছে। তার অংশ হিসেবে এই পরিবর্তন। শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকে নয়, অনেক জায়গায় পরিবর্তন হচ্ছে, আরও হবে।’

    আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে এমন এক সময়ে নতুন গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হলো, যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতর বিক্ষোভ ও আন্দোলন (Protest inside Central Bank) চলছিল। অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের ব্যানারে কর্মকর্তারা তার পদত্যাগের দাবিতে কলমবিরতির ঘোষণা দিয়েছিল। 

    দিনভর যা হলো

    ২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে বিভিন্ন দাবি পূরণ এবং তিন কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানো ও বদলির আদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে প্রতিবাদ সমাবেশ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। এসব দাবি না মানলে আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে গভর্নরের পদত্যাগের দাবিতে কলমবিরতিতে যাবেন কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা—এমন ঘোষণা দেওয়া হয় সমাবেশ থেকে।

    বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের ‘স্বৈরাচারী’ আচরণের প্রতিবাদে সংস্থাটির সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অংশ নেন।

    প্রতিবাদ সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, ‘আমরা চেয়েছি বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন, কিন্তু পেয়েছি স্বৈরশাসন। এই স্বৈরশাসনে আমরা থাকতে চাই না। আমাদের কিছু ন্যায্য দাবি নিয়ে বারবার গভর্নরের কাছে গিয়েছিলাম, কিন্তু তিনি সেগুলো আমলে নেননি। বরং উনি দমন-নিপীড়নের আশ্রয় নিয়েছেন।’

    শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে ভরিয়ে ফেলা হয়েছে। ওনার (গভর্নর) অনেক উপদেষ্টা ও পরামর্শক প্রয়োজন, কিন্তু এখন পর্যন্ত অর্থনীতির জন্য কোনো কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে দেখি না। উনি ক্রমাগতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে মনোবল ভেঙে দিচ্ছেন। এ ছাড়া ব্যাংক খাত নিয়ে যে ধরনের মন্তব্য করে যাচ্ছেন, তাতে ব্যাংক খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। গভর্নরের ইচ্ছেমতো কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলবে না। সবকিছু নিয়ে ওনাকে জবাবদিহি করতে হবে।’

    এ সময় শোকজ ও বদলি প্রত্যাহারের দাবি জানান শাহরিয়ার সিদ্দিকী। তা না হলে সবাইকে শোকজ ও বদলির দাবি জানান।

    বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও ডেপুটি হেড অব বিএফআইইউ মফিজুর রহমান খান চৌধুরী বলেন, ‘বিগত সাত-আট মাস ধরে ন্যায্য দাবি উত্থাপন করেছি গভর্নরের কাছে। কিন্তু তিনি তা মানেননি। আমরা আশা করি, উনি আমাদের ন্যায্য দাবিদাওয়া মেনে নেবেন। কোনো অন্যায্য দাবি জানানো হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মর্যাদা রক্ষায় যথাযথ পদক্ষেপ নেবেন।’

    অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘গভর্নর বিভিন্ন স্বৈরাচারী পদক্ষেপ নিয়েছেন, এসবের তীব্র নিন্দা জানাই। গতকাল আমাদের তিনজনকে শোকজ নোটিশের জবাব দেওয়ার আগেই বদলি করা হয়েছে। আমরা বিষয়টি সমাধানের জন্য ওনার কাছে গেলেও উনি দেখা করেন না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আমাদের শোকজ নোটিশ ও বদলি প্রত্যাহারসহ অন্যান্য দাবিদাওয়া আজকের মধ্যে বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছি। যদি তা বাস্তবায়ন না করা হয়, তাহলে আগামীকাল থেকে প্রতীকী কলমবিরতিতে যাব। আর রোববার সর্বস্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।’

    বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ ও গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে ‘স্বৈরাচার’ বলেছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের তিন কর্মকর্তা। আট দিনের মাথায় গতকাল মঙ্গলবার ওই তিন কর্মকর্তাকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়। এর আগে গত সোমবার তাঁদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।

    উপসংহার

    মোঃ মোস্তাকুর রহমান এফসিএমএ-র গভর্নর হিসেবে নিয়োগ বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ‘টেকনোক্র্যাট’ নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দক্ষতা দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়ক হবে বলেই বিশ্লেষকরা মনে করছেন। গুলশানের বাসিন্দা এই নিভৃতচারী কিন্তু অত্যন্ত দক্ষ পেশাদার ব্যক্তি এখন ১৬ কোটি মানুষের আর্থিক নিরাপত্তার পাহারাদার।

  • ১৫০০ কোটি টাকার FSFDMSME তহবিল: ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য গেম-চেঞ্জার

    বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হলো মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (MSME) শিল্প। তবে বাস্তব চিত্র হলো, এই খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে এবং সহনীয় সুদে ঋণ পাওয়া এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ঋণের উচ্চ সুদ এবং জামানতের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোগ অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়। এই সংকট নিরসনে বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ‘এসএমইএসপিডি সার্কুলার নং-০৩’-এর মাধ্যমে ১৫০০ কোটি টাকার একটি বিশাল আবর্তনশীল (Revolving) পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে, যার নাম ‘Financial Sector Fund for the Development of Micro, Small and Medium Enterprises (FSFDMSME)’। এই তহবিলটি ১৭ মার্চ ২০২৫ তারিখে জারি করা এসএমইএসপিডি সার্কুলার নং-০১-এর নির্দেশনার আলোকে পরিচালিত হবে এবং দেশের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এক নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

    মূল লক্ষ্য এবং গুরুত্ব

    Financial Sector Fund for the Development of Micro, Small and Medium Enterprises (FSFDMSME) বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়নের জন্য গঠিত আর্থিক খাত তহবিলের মূল লক্ষ্য এবং গুরুত্ব নিচে আলোচনা করা হলো:

    তহবিলের মূল লক্ষ্য: বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব অর্থায়নে ১,৫০০ (এক হাজার পাঁচশত) কোটি টাকার এই আবর্তনশীল পুনঃ অর্থায়ন তহবিলটি গঠন করেছে। এর পেছনে প্রধান লক্ষ্যগুলো হলো:

    ১. সহজ অর্থায়ন নিশ্চিতকরণ: এমএসএমই (MSME) খাতে অর্থায়নের প্রবাহ সহজ করা এবং এই খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা ।

    ২. উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বৃদ্ধি: ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা, যা দেশের শিল্পায়নে সহায়তা করবে ।

    ৩. টেকসই উন্নয়ন: এমএসএমই খাতের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা প্রদান করা ।

    ৪. প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ: উচ্চ সুদের হার, জামানতের সীমাবদ্ধতা এবং অর্থায়নের অপ্রতুলতার কারণে এমএসএমই উদ্যোক্তারা যে বাধার সম্মুখীন হন, তা দূর করে তাদের কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ সম্প্রসারণে সহায়তা করা ।

    তহবিলের গুরুত্ব: বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এই তহবিলটির গুরুত্ব অপরিসীম:

    • অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান: টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (MSME) খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই তহবিলটি এই খাতের বিকাশে সরাসরি সহায়তা করবে ।
    • স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা: এই তহবিলের আওতায় গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সুদের হার সর্বোচ্চ ৭% নির্ধারণ করা হয়েছে, যা উদ্যোক্তাদের জন্য অত্যন্ত সাশ্রয়ী। প্রচলিত উচ্চ সুদের হারের তুলনায় এটি ব্যবসার খরচ কমাতে সাহায্য করবে ।
    • ব্যবসা সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ: অর্থনৈতিকভাবে টেকসই এবং আর্থিকভাবে উপযুক্ত (Viable) উদ্যোগগুলোর ব্যবসা সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণের জন্য এই তহবিল থেকে মেয়াদি ও চলতি মূলধন ঋণ পাওয়া যাবে ।
    • ঋণ প্রাপ্তির সুযোগ: নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ অগ্রাধিকার না থাকলেও, মাইক্রো উদ্যোক্তারা ১ কোটি টাকা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত পুনঃ অর্থায়ন সুবিধা পাবেন, যা তাদের ব্যবসার পরিধি বাড়াতে সহায়ক হবে ।

    সংক্ষেপে, দেশের এমএসএমই খাতের কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান করে একটি শক্তিশালী ও টেকসই শিল্প খাত গড়ে তোলাই হলো FSFDMSME তহবিলের মূল উদ্দেশ্য।

    অবিশ্বাস্য সুদের হার

    বর্তমান বাজার ব্যবস্থায় যেখানে ঋণের সুদহার ক্রমবর্ধমান, সেখানে এই তহবিলের আওতায় উদ্যোক্তারা অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে অর্থায়ন পাবেন। এই তহবিলের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো এর ‘স্প্রেড’ (Spread) বা মুনাফার ব্যবধান।

    বাংলাদেশ ব্যাংক এই তহবিল থেকে অংশগ্রহণকারী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে (Participatory Financial Institution – PFI) মাত্র ২ শতাংশ সুদে অর্থ সরবরাহ করবে। আর গ্রাহক পর্যায়ে এর সর্বোচ্চ সুদহার হবে ৭ শতাংশ।

    “এই তহবিলের আওতায় প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় গ্রাহক পর্যায়ে সুদ সর্বোচ্চ ৭% হবে।”

    ইসলামী শরীয়াহ ভিত্তিক অর্থায়নের ক্ষেত্রেও একই হার (সর্বোচ্চ ৭%) প্রযোজ্য হবে। ব্যাংকগুলোর জন্য এখানে ৫ শতাংশের একটি বড় স্প্রেড রাখা হয়েছে, যা বর্তমান তারল্য সংকটের সময়ে পিএফআই (PFI) গুলোকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে বিশেষভাবে উৎসাহিত করবে।

    মাইক্রো ও এসএমই খাতের জন্য বিশাল ঋণের সীমা

    এই তহবিলের আওতায় ঋণের সীমা এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যেন প্রান্তিক পর্যায়ের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে মাঝারি শিল্প মালিকরাও উপকৃত হতে পারেন।

    • মাইক্রো এন্টারপ্রাইজ: একজন উদ্যোক্তা ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ১.০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। গ্রামীণ বা মফস্বল পর্যায়ের একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জন্য ১ কোটি টাকা ঋণ পাওয়া তার ব্যবসার আধুনিকায়ন এবং বাজার সম্প্রসারণের জন্য একটি অভাবনীয় সুযোগ।
    • ক্ষুদ্র ও মাঝারি এন্টারপ্রাইজ (SME): অপেক্ষাকৃত বড় পরিসরের ব্যবসার জন্য এই সীমা ৫.০০ কোটি টাকা পর্যন্ত।

    পলিসি বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই ঋণের মাধ্যমে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো বড় শিল্পে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাথমিক পুঁজি সংস্থান করতে পারবে।

    দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের সুযোগ: ৭ বছর মেয়াদী ঋণ

    ব্যবসার প্রকৃতি ভেদে এই তহবিলে দুই ধরণের অর্থায়ন সুবিধা রাখা হয়েছে:

    • চলতি মূলধন (Working Capital): ব্যবসা পরিচালনার দৈনন্দিন খরচ মেটাতে সর্বোচ্চ ১ বছর মেয়াদী ঋণ।
    • মেয়াদী ঋণ (Term Loan): যন্ত্রপাতি ক্রয় বা ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ১ বছরের অধিক হতে সর্বোচ্চ ৭ বছর মেয়াদী ঋণ সুবিধা।

    একজন উদ্যোক্তার জন্য ৭ বছর মেয়াদী ঋণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি তাকে দীর্ঘমেয়াদী ব্যবসায়িক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এবং কিস্তি পরিশোধের চাপ কমিয়ে ব্যবসার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।

    উদ্যোক্তার নিজস্ব অংশগ্রহণ ও ব্যাংকের অর্থায়ন অনুপাত

    এই তহবিলের সুবিধা নিতে হলে উদ্যোক্তাকে তার প্রকল্পের ‘ভায়াবিলিটি’ (Viability) বা আর্থিক উপযুক্ততা প্রমাণ করতে হবে। নীতিমালার ১.২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, একটি প্রকল্পের মোট ব্যয়ের সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ উদ্যোক্তাকে নিজস্ব উৎস থেকে বিনিয়োগ করতে হবে। অর্থাৎ, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থায়ন করতে পারবে। এই ১০:৯০ অনুপাতটি নতুন ও সৃজনশীল উদ্যোক্তাদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক, কারণ এতে প্রাথমিক পুঁজির সীমাবদ্ধতা থাকলেও বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া সম্ভব।

    যেখানে এই ঋণ পাওয়া যাবে না: একটি সতর্কবার্তা

    বাংলাদেশ ব্যাংক এই তহবিলটি কেবলমাত্র উৎপাদনশীল এবং পরিবেশবান্ধব খাতের জন্য সংরক্ষিত রাখতে চায়। তাই সার্কুলার-এর ‘সংযোজনী-ক’ ও ‘সংযোজনী-খ’ অনুযায়ী নিচের খাত ও উদ্দেশ্যগুলো এই ঋণের জন্য অযোগ্য বিবেচিত হবে:

    ক. অযোগ্য খাতসমূহ (সংযোজনী-ক অনুযায়ী)

    “Financial Sector Fund for the Development of Micro, Small and Medium Enterprises (FSFDMSME)” বা “মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি এন্টারপ্রাইজ উন্নয়ন ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর ফান্ড” এর নীতিমালার সংযোজনী-ক অনুযায়ী নিম্নলিখিত খাতগুলো ঋণের জন্য অযোগ্য (Non-eligible) হিসেবে বিবেচিত হবে:

    • ফসল ও মৎস্য উৎপাদন: সরাসরি ফসল চাষ বা মাছ চাষ সংক্রান্ত কার্যক্রম (এক্ষেত্রে এগ্রো-প্রসেসিং থেকে এটি আলাদা করা হয়েছে)।
    • রিয়েল এস্টেট: আবাসন খাতের উন্নয়ন বা জমি ক্রয় এবং জমি ব্যবহারের অধিকার অর্জন।
    • আর্থিক ও বিমা সেবা: যেকোনো ধরণের আর্থিক পরিষেবা বা বিমা সংক্রান্ত কার্যক্রম।
    • ক্ষতিকর পরিবেশগত প্রকল্প: পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বা প্রচলিত পরিবেশগত মানদণ্ডের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রকল্প।
    • তামাক ও নেশাজাত দ্রব্য: তামাকজাত দ্রব্য উৎপাদন বা নেশাজাত পানীয় ক্রয়-বিক্রয়।
    • অস্ত্র ও বিলাসিতা: অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন এবং বার বা অনুরূপ বিনোদনমূলক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা।
    • মূল্যবান ধাতু: সোনা, রুপা বা অন্যান্য মূল্যবান ধাতু (Precious Metal) ক্রয়-বিক্রয় ও ব্যবসা [৪]।
    • পানশালা: বার, পাব ও অনুরূপ প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ।
    • বিনোদন: আমোদ-প্রমোদ ও বিনোদনমূলক কার্যক্রম।দ্রষ্টব্য: তবে অ্যামিউজমেন্ট পার্ক, পর্যটন, চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং টেলিভিশন সম্প্রচার কার্যক্রম এই নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত (অর্থাৎ এই বিশেষ ক্ষেত্রগুলো ঋণ পাওয়ার যোগ্য) ।
    • অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম: অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন, সংরক্ষণ বা ব্যবসা ।
    • সামাজিকভাবে ক্ষতিকর: সামাজিক শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও স্থিতিশীলতার পরিপন্থী বা ক্ষতিকর যেকোনো কার্যক্রম ।

    মূলত অনুৎপাদনশীল খাতে ঋণের অপব্যবহার রোধ এবং নৈতিক ব্যাংকিং নিশ্চিত করতেই বাংলাদেশ ব্যাংক এই কঠোর ফিল্টারগুলো যুক্ত করেছে।এই খাতগুলো ব্যতীত অন্যান্য উৎপাদনশীল ও সেবা খাতে এমএসএমই উদ্যোক্তারা এই তহবিল থেকে ঋণ সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন।

    খ. অযোগ্য উদ্দেশ্যসমূহ (সংযোজনী-খ অনুযায়ী):

    ১. ভূমি ক্রয় অথবা ভূমি ব্যবহারের অধিকার অর্জন।

    ২. কর, শুল্ক বা আমদানি শুল্ক পরিশোধ।

    ৩. ট্রেড ফাইন্যান্স বা বাণিজ্যিক অর্থায়ন সংক্রান্ত কার্যক্রম।

    ৪. ভোক্তা ঋণ বা ব্যক্তিগত ঋণ।

    ৫. পেট্রোকেমিকেল ও পেট্রোকেমিকেলজাত পণ্য উৎপাদন, বিতরণ ও বিপণন।

    ৬. পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর অথবা প্রযোজ্য পরিবেশগত মানদণ্ডের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রকল্প।

    ৭. নেশা জাতীয় পানীয় উৎপাদন অথবা ক্রয়-বিক্রয়।

    ৮. তামাকজাত দ্রব্য উৎপাদন অথবা ক্রয়-বিক্রয়।

    ভবিষ্যৎ ভাবনা

    ১৫০০ কোটি টাকার ‘FSFDMSME’ তহবিল কেবল একটি সাধারণ ঋণ প্রকল্প নয়, বরং এটি দেশের তৃণমূল পর্যায়ের অর্থনীতির ভিত শক্ত করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। ৭ শতাংশের নামমাত্র সুদ, দীর্ঘ ৭ বছরের মেয়াদ এবং প্রকল্পের ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যাংক অর্থায়ন—এই তিনটি পরামিতি উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। এটি একটি আবর্তনশীল তহবিল হওয়ায়, আদায়কৃত অর্থ পুনরায় নতুন উদ্যোক্তাদের দেওয়া সম্ভব হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাজারের তারল্য প্রবাহ বজায় রাখবে।

    পরিশেষে প্রশ্নটি থেকেই যায়— এই সুলভ ঋণ ও নীতিগত সহায়তা কি আমাদের প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের দেশীয় বাজারের গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নেতৃত্ব দেওয়ার মতো সক্ষম করে তুলতে পারবে? উত্তরটি নির্ভর করছে ব্যাংকগুলোর দ্রুত ঋণ বিতরণ এবং উদ্যোক্তাদের সঠিক বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের ওপর।

  • মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ ২০২৬: ক্ষুদ্রঋণে নতুন দিগন্ত

    বাংলাদেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও দারিদ্র্য বিমোচনে ক্ষুদ্রঋণ খাত দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। এই খাতকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক, জবাবদিহিমূলক ও টেকসই করতে অন্তর্বর্তী সরকার ‘মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ ২০২৬’ জারি করেছে।
    ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত এই অধ্যাদেশ ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে একটি মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

    এই ব্লগে আমরা সহজ ভাষায় জানবো—এই অধ্যাদেশ কী, কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ এবং সাধারণ ঋণগ্রহীতা, উদ্যোক্তা ও অর্থনীতির জন্য এর অর্থ কী।


    মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক কী?

    অধ্যাদেশ অনুযায়ী, মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক হলো বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক লাইসেন্সপ্রাপ্ত একটি বিশেষায়িত ব্যাংক, যা মূলত স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য আর্থিক সেবা প্রদানের উদ্দেশ্যে গঠিত।

    এটি—

    • একটি সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান
    • নিজস্ব সিলমোহর ও স্থায়ী ধারাবাহিকতা সম্পন্ন
    • প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় আনার লক্ষ্যে পরিচালিত

    এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য

    এই ব্যাংকটি মূলত একটি ‘সামাজিক ব্যবসা’ মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যার মূল লক্ষ্যগুলো হলো:

    দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান: দেশের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমকে আরও সুসংহত করা এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য স্ব-কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন করা ।

    আর্থিক অন্তর্ভুক্তি: প্রচলিত ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা নিম্ন আয়ের মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ, সঞ্চয় এবং বীমার মতো আর্থিক পরিষেবার আওতায় এনে তাদের স্বয়ংসম্পূর্ণ করা ।

    মালিকানা নিশ্চিত করা: ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের কেবল গ্রাহক হিসেবে নয়, বরং শেয়ার কেনার মাধ্যমে ব্যাংকের মালিক হিসেবে অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা ।

    সামাজিক উন্নয়ন: বিনিয়োগকারীরা তাদের মূল বিনিয়োগের অতিরিক্ত কোনো মুনাফা বা লভ্যাংশ ব্যক্তিগতভাবে নেবেন না; বরং অর্জিত মুনাফা পুনরায় সামাজিক ও দারিদ্র্য বিমোচন খাতে ব্যয় করা হবে ।

    মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ ২০২৬-এর মূল দর্শন হলো “সামাজিক ব্যবসা” (Social Business Model)। এর প্রধান লক্ষ্যগুলো হলো—

    • নিম্ন আয়ের মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য
      ঋণ, সঞ্চয় ও আর্থিক সেবা সহজলভ্য করা
    • ঋণগ্রহীতাদের শুধু গ্রাহক নয়,
      ব্যাংকের মালিকানায় অংশীদার করা
    • অর্জিত মুনাফা ব্যক্তিগত লভ্যাংশে নয়,
      পুনরায় সামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে বিনিয়োগ করা

    অধ্যাদেশে সামাজিক ব্যবসা সম্পর্কে বলা হয়েছে, এটি এমন একটি সামাজিক উদ্যোগ, যার মূল উদ্দেশ্য সামাজিক সমস্যার সমাধান করা এবং যাতে বিনিয়োগকারীরা কেবল তাদের মূল অর্থ ফেরত পাবেন, তবে কোন মুনাফা পাবে না। যেসব প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ ২৫ জন জনবল এবং ১.৫০ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে, সেগুলোকে ক্ষুদ্র উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এতে।

    মূলধন ও মালিকানা কাঠামো

    এই অধ্যাদেশে প্রথমবারের মতো ক্ষুদ্রঋণ খাতে একটি সুস্পষ্ট মূলধন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে—ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন হবে ৫০০ কোটি টাকা, যা ১০০ টাকা মূল্যমানের ৫ কোটি শেয়ারে বিভক্তি থাকবে। এর পরিশোধিত মূলধন হবে কমপক্ষে ২০০ কোটি টাকা, যা ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডার ও অন্যান্য শেয়ারহোল্ডাররা পরিশোধ করবেন।

    এর মধ্যে ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডারদের মূলধনের পরিমাণ হবে কমপক্ষে ৬০%, যা ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর ক্রমান্বয়ে পরিশোধযোগ্য হবে। অর্থাৎ, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার পর এই ব্যাংক থেকে যারা ঋণ নেবেন, তারা পরবর্তীতে ১০০ টাকা মূল্যমানের শেয়ার কিনে ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডার হবেন।

    🔹 মূলধন

    • অনুমোদিত মূলধন: ৫০০ কোটি টাকা
      (১০০ টাকা মূল্যমানের ৫ কোটি শেয়ার)
    • ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন: ২০০ কোটি টাকা
    • প্রতিষ্ঠাতা সংস্থার অবদান: কমপক্ষে ১০ কোটি টাকা

    🔹 মালিকানা

    • অন্তত ৬০% মালিকানা থাকবে সাধারণ ঋণগ্রহীতাদের হাতে
    • ঋণগ্রহীতারা শেয়ার কিনে ব্যাংকের অংশীদার হতে পারবেন
    • ব্যাংকটি কোনো স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হতে পারবে না

    ➡️ অর্থাৎ, এই ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে যাবে ঋণগ্রহীতাদের হাতেই—যা বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় একেবারেই নতুন ধারণা।


    ব্যাংকের প্রধান কার্যাবলি ও ক্ষমতা

    এই ব্যাংকটি মূলত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন এবং তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে । মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বিস্তৃত ক্ষমতা ভোগ করবে—

    ১. আমানত গ্রহণ: ব্যাংকটি তার ঋণগ্রহীতা সদস্যদের পাশাপাশি যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে আমানত সংগ্রহ করতে পারবে

    ২. ঋণ সহায়তা: নতুন উদ্যোক্তাদের আত্ম-কর্মসংস্থান, শিল্প ও কৃষিজাত পণ্য, গবাদিপশু এবং যন্ত্রপাতির জন্য ঋণ প্রদান করা

    ৩. উদ্যোগ মূলধন (Startup Capital) প্রদান: ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় ‘উদ্যোগ মূলধন’ সরবরাহ করা ।

    ৪. কারিগরি ও প্রশাসনিক সহায়তা: ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসার মানোন্নয়নে কোনো প্রকার ফি ছাড়াই প্রয়োজনীয় কারিগরি ও প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করা ।

    ৫. জামানত ও বন্ধক গ্রহণ: ঋণের বিপরীতে স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি জামানত, বন্ধক (Mortgage) বা রেহন হিসেবে গ্রহণ করা ।

    ৬. বীমা সেবা: দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য দূরীকরণে এবং তাদের আর্থিক সুরক্ষায় বীমা জাতীয় পরিষেবা প্রদান করা ।

    ৭. এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন: বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি সাপেক্ষে সরকারের এজেন্ট হিসেবে কাজ করা অথবা অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে সেবা প্রদান করা [৩৪]।

    ৮. বিরোধ নিষ্পত্তি: বকেয়া ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং প্রয়োজনে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR) পদ্ধতি ব্যবহার করা ।

    ✔️ আর্থিক সেবা

    • যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে আমানত গ্রহণ
    • স্ব-কর্মসংস্থান ও ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য ঋণ প্রদান
    • নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য স্টার্টআপ ক্যাপিটাল ও বিনিয়োগ

    ✔️ সহায়তা ও সুরক্ষা

    • ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য
      বিনামূল্যে প্রশাসনিক ও কারিগরি সহায়তা
    • ঋণের বিপরীতে
      স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বন্ধক গ্রহণ

    ✔️ প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা

    • সরকারের এজেন্ট হিসেবে কাজ করা
    • অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে সেবা প্রদান

    পরিচালনা পর্ষদ (Board of Directors)

    সুশাসন নিশ্চিত করতে পরিচালনা পর্ষদের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অধ্যাদেশে বোর্ড গঠনের বিষয়ে দুটি কাঠামোর উল্লেখ পাওয়া যায়, তবে মূল দর্শন একই—ঋণগ্রহীতাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।

    পরিচালনা বোর্ডের কাঠামো বিষয়ে অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ড হবে ৯ সদস্যের। এর মধ্যে ৪ জন পরিচালক ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হবেন। এ ছাড়া ৩ জন মনোনীত পরিচালক, ২ জন স্বতন্ত্র পরিচালক এবং ভোটাধিকারবিহীন একজন পদাধিকারবলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকবেন। কোনো পরিচালক একাদিক্রমে দুই মেয়াদের বেশি দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।

    সাধারণভাবে বোর্ডে থাকবে—

    • ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডারদের প্রতিনিধিত্ব
    • অন্যান্য শেয়ারহোল্ডার সংস্থার মনোনীত সদস্য
    • বাংলাদেশ ব্যাংক মনোনীত পরিচালক
    • একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (MD)
      (পদাধিকারবলে, ভোটাধিকার ব্যতীত)

    ব্যবস্থাপনা পরিচালক (MD)

    • ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা
    • নিয়োগের আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন বাধ্যতামূলক
    • দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব তার ওপর ন্যস্ত

    ঋণ আদায় ও গ্রাহক সুরক্ষা নীতি

    এই অধ্যাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো—
    কঠোরতা ও মানবিকতার ভারসাম্য।

    ব্যাংকটির কোনো ঋণগ্রহীতা খেলাপি হলে তাকে ১৫ দিনের নোটিশ না দিয়ে খেলাপি ঋণ আদায় কার্যক্রম শুরু করা যাবে না।
     
    খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের শর্ত সাপেক্ষে ঋণ পুনঃতফসিল করা, পুনগর্ঠন বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারবে। এতেও খেলাপি আদায়ে সন্তোষজনক অগ্রগতি না হলে অর্থঋণ আদালত আইনসহ প্রচলিত অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে ব্যাংক।
     
    তবে খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংক জবরদস্তি করা যাবে না উল্লেখ করে অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, ‘খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক স্বচ্ছতা, সামাজিক সংবেদনশীলতা এবং ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় গ্রহণ করবে এবং জবরদস্তি বা হয়রানিমূলক, অবমাননাকর বা মানব মর্যাদা পরিপন্থি কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারবে না।’

    🔹 ঋণ আদায় প্রক্রিয়া

    • খেলাপির ক্ষেত্রে কমপক্ষে ১৫ দিনের নোটিশ
    • প্রথমে পুনঃতফসিল বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR)
    • প্রয়োজনে অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ অনুযায়ী মামলা

    🔹 মানবিক সুরক্ষা

    • কোনো প্রকার জবরদস্তি, হয়রানি বা অপমানজনক আচরণ নিষিদ্ধ
    • ঋণ আদায়ে মানব মর্যাদা রক্ষা বাধ্যতামূলক

    লভ্যাংশ নীতি ও নিয়ন্ত্রণ

    ব্যাংকটি সামাজিক ব্যবসায় পরিচালিত হওয়ায় এর বিনিয়োগকারীরা যে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করবেন, ব্যাংকটির লভ্যাংশ থেকে সেই পরিমাণ অর্থ ফেরত পাবেন। ব্যাংক অতিরিক্ত মুনাফা করলে তা সংরক্ষিত তহবিলে রেখে তা সামাজিকখাতে ব্যবহার করা হবে।

    • সাধারণ বিনিয়োগকারীরা মূল বিনিয়োগের বাইরে অতিরিক্ত লভ্যাংশ পাবেন না
    • তবে সাধারণ ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষেত্রে শিথিলতা রাখা যেতে পারে
    • লক্ষ্য একটাই—মুনাফা নয়, সামাজিক সুফল

    নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি

    বাংলাদেশ ব্যাংক এই ব্যাংকের লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করবে এবং প্রয়োজনে এর পরিচালনা বোর্ড বাতিল বা চেয়ারম্যান/পরিচালককে অপসারণের ক্ষমতা রাখবে।

    ব্যাংকের সকল কার্যক্রম ‘ব্যাংক-কোম্পানী আইন, ১৯৯১’ এবং ‘মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটি আইন, ২০০৬’ এর সংশ্লিষ্ট বিধানাবলি দ্বারাও নিয়ন্ত্রিত হবে।

    • লাইসেন্সিং ও সার্বিক তদারকি করবে বাংলাদেশ ব্যাংক
    • ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালিত হবে—
      • ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১
      • মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি আইন, ২০০৬
    • প্রতি বছর বাধ্যতামূলক নিরীক্ষা
    • নির্দিষ্ট সংরক্ষিত তহবিল গঠন

    উপসংহার

    মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ ২০২৬ বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ খাতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি শুধু ঋণ দেওয়ার কাঠামো নয়, বরং—

    • ঋণগ্রহীতাকে মালিক বানানোর প্রয়াস
    • সামাজিক ব্যবসার দর্শন প্রতিষ্ঠা
    • প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থিক ক্ষমতায়নের আইনি ভিত্তি

    সঠিক বাস্তবায়ন হলে এই অধ্যাদেশ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির গল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

  • ৯ ফাইন্যান্স কোম্পানি অবসায়নের অনুমোদন: অর্থনীতির শুদ্ধি অভিযান

    বাংলাদেশের আর্থিক খাতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থতার পর অবশেষে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক (BB)। ৩০ নভেম্বর অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় ৯টি নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান (NBFI) বা ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অবসায়ন (Liquidate) করার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এটিকে আর্থিক খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় শুদ্ধি অভিযানগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে দেখা হচ্ছে।

    এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের ফলে নিয়ন্ত্রকরা এখন ‘ব্যাংক রেজোলিউশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫’ এবং ‘ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন ২০২৩’ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর আনুষ্ঠানিক অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে।

    অবসায়নের তালিকায় থাকা ৯ প্রতিষ্ঠান

    এই ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে সম্ভাব্য অবসায়নের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে:

    1. পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (PLFS)
    2. ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস
    3. আভিভা ফাইন্যান্স
    4. এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট
    5. ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট
    6. বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (BIFC)
    7. প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স
    8. জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি
    9. প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড

    এই ৯টি প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে ‘অব্যবহারযোগ্য’ (unusable) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল বেশ কিছু মূল সূচকের ভিত্তিতে। এর মধ্যে প্রধান তিনটি সূচক হলো: আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে ক্রমাগত ব্যর্থতা, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং তীব্র মূলধন ঘাটতি

    বিপর্যয়ের ভয়াবহ চিত্র: কেন এই কঠোর সিদ্ধান্ত?

    কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশে মোট ৩৫টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার মধ্যে ২০টিকে সমস্যাগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে

    যে ৯টি প্রতিষ্ঠান অবসায়নের পথে, তারা একাই আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের মোট খেলাপি ঋণের অর্ধেকেরও বেশি (প্রায় ৫২ শতাংশ) দায় বহন করে। এসব প্রতিষ্ঠানের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার ৮৯ কোটি টাকা।

    বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্বল শাসনব্যবস্থা, অস্বচ্ছ আর্থিক বিবরণী এবং দীর্ঘদিনের অনিয়মের ফলেই এই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। ৯টি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বাস্থ্য এতটাই খারাপ যে, সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়া তাদের দায় পরিশোধ করা প্রায় অসম্ভব।

    আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপির হারের কিছু চিত্র নিম্নরূপ:

    • এফএএস ফাইন্যান্স: মোট ঋণের ৯৯.৯৩ শতাংশই খেলাপি এবং ক্রমপুঞ্জিভূত লোকসান ১,৭১৯ কোটি টাকা।
    • ফারইস্ট ফাইন্যান্স: খেলাপি ঋণ ৯৮ শতাংশ, লোকসান ১,০১৭ কোটি টাকা।
    • বিআইএফসি: খেলাপি ঋণ ৯৭.৩০ শতাংশ, লোকসান ১,৪৮০ কোটি টাকা।
    • ইন্টারন্যাশনাল লিজিং: খেলাপি ঋণ ৯৬ শতাংশ, পুঞ্জিভূত লোকসান ৪,২১৯ কোটি টাকা।
    • পিপলস লিজিং: খেলাপি ঋণ ৯৫ শতাংশ, লোকসান ৪,৬২৮ কোটি টাকা।

    আমানতকারীদের জন্য স্বস্তি: সরকারের বিশেষ বরাদ্দ

    এই অবসায়নের সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত ছিলেন সাধারণ আমানতকারীরা, যারা বছরের পর বছর ধরে তাদের পরিপক্ব আমানতের অর্থ ফেরত পেতে অপেক্ষা করছেন।

    বাংলাদেশ ব্যাংক নিশ্চিত করেছে যে, আমানতকারীদের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের বক্তব্য অনুযায়ী, লিকুইডেশন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই আমানতকারীদের পাওনা ফেরত দেওয়া হবে। আমানতকারীদের পাওনা মেটানোর জন্য সরকার প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার মৌখিক অনুমোদন দিয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্রমতে, সমস্ত লোকসান সমন্বয় এবং পাওনা নিষ্পত্তির জন্য সরকারের প্রাথমিক ব্যয় প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা হতে পারে।

    এই ৯টি প্রতিষ্ঠানে আটকে থাকা মোট আমানতের পরিমাণ হলো ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে গ্রাহকদের নিট ব্যক্তি আমানতের পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা।

    আগামীর পথ: তদারকি ও পুনর্গঠন

    বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পদক্ষেপ আর্থিক খাতে একটি আক্রমণাত্মক হস্তক্ষেপের (aggressive intervention) ইঙ্গিত দেয়। নিয়ন্ত্রকরা এখন প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা, লিকুইডেটর নিয়োগ, সম্পদ বিক্রি এবং পাওনাদারদের মধ্যে প্রাপ্ত অর্থ বণ্টনের কাজ শুরু করবে।

    উল্লেখ্য, এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে গত ২২ মে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তারা সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক অবসায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে অগ্রসর হয়।

    এই অবসায়নের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে পাঁচটি দুর্বল শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই একীভূতকরণ ও অবসায়ন—উভয় সিদ্ধান্তই স্পষ্ট করে যে আর্থিক খাতে অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম আর প্রশ্রয় পাবে না, যা এই খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য একটি ঐতিহাসিক ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ

  • চূড়ান্ত অনুমোদন পেল সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক

    দেশের ইতিহাসে বৃহত্তম সরকারি ইসলামী ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু: আমানত সুরক্ষা ও খেলাপি ঋণের চ্যালেঞ্জ

    দেশের আর্থিক খাতে গভীর স্থিতিশীলতার সংকট মোকাবিলায় এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপে পাঁচটি আর্থিকভাবে দুর্বল শরিয়াহ্‌ভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করে গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করেছে। এর মধ্য দিয়ে দেশের সবচেয়ে বড় ও সরকারি মালিকানাধীন এই ইসলামী ব্যাংকটির কার্যক্রম শুরু করতে আর কোনো বাধা রইল না।

    রোববার, ৩০ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ বোর্ড সভায় এই চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের সভাপতিত্বে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

    কেন এই একীভূতকরণ?

    এই বৃহৎ একীভূতকরণের মূল কারণ ছিল পাঁচটি শরিয়াহ্‌ভিত্তিক ব্যাংক—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের চরম আর্থিক দুর্বলতা এবং আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়া

    বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই ব্যাংকগুলোর আর্থিক সংকটের চিত্র ভয়াবহ:

    • আমানত ও আমানতকারীর সংখ্যা: এই ৫টি ব্যাংকে বর্তমানে ৭৫ লাখ আমানতকারীর ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে।
    • ঋণের পরিমাণ: এর বিপরীতে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ রয়েছে ১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা
    • খেলাপি ঋণের বিস্ফোরণ: এই ঋণের একটি বিশাল অংশ, প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৭৬ শতাংশ, খেলাপিতে পরিণত হয়েছে

    কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এই পরিস্থিতিকে সামাল দিতে একীভূতকরণকে অপরিহার্য বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ব্যাংকগুলো একীভূত করা ছাড়া “বিকল্প ছিল না”। তিনি আরও প্রত্যাশা করেন যে সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে এই প্রক্রিয়া থেকে “অর্থনীতির জন্য ভালো কিছু হবে”

    মূলধন ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা

    নতুন ব্যাংকটির যাত্রা শুরুর সাথে সাথে আর্থিক খাতে আস্থা ফেরাতে সরকার বিশাল মূলধন জোগান দিচ্ছে:

    • মোট পরিশোধিত মূলধন: নতুন ব্যাংকটির মোট পরিশোধিত মূলধন হবে ৩৫ হাজার কোটি টাকা
    • সরকারের অংশ: সরকার মোট ২০ হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে। প্রাথমিক মূলধন হিসেবে সরকার জোগান দিচ্ছে দশ হাজার কোটি টাকা
    • আমানতকারীদের শেয়ার: বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের জমানো টাকার বিপরীতে শেয়ার হিসেবে দেওয়া হবে।
    • অনুমোদিত মূলধন: প্রাথমিকভাবে এর অনুমোদিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা

    আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং তারল্য প্রবাহ বাড়াতে সরকারি তহবিল এই নতুন ব্যাংকে রাখা হবে। পাশাপাশি আকর্ষণীয় মুনাফা দিয়ে সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ রাখতে উৎসাহিত করা হবে।

    অর্থ ফেরত ও সুরক্ষা স্কিম

    চূড়ান্ত অনুমোদনের পর আমানতকারীদের অর্থ ফেরত সংক্রান্ত স্কিম ঘোষণা করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে:

    • ক্ষুদ্র আমানতকারীদের অর্থ প্রদানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার থাকবে।
    • আমানতকারীরা শুরুতে আমানত বিমা তহবিল থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলন করতে পারবেন।
    • বাকি টাকা কোন উপায়ে, কী হারে মুনাফা দিয়ে এবং ধাপে ধাপে তোলা যাবে, তার বিস্তারিত স্কিম কর্মসূচি কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি সপ্তাহে ঘোষণা করতে পারে।

    উল্লেখ্য, একীভূত হওয়ার আগে গত ৫ নভেম্বর আর্থিকভাবে দুর্বল এই পাঁচটি শরিয়াভিত্তিক ব্যাংককে অকার্যকর ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছিল।

    নতুন ব্যাংকের প্রশাসনিক কাঠামো

    ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ এর কার্যক্রম দ্রুত শুরু করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু করেছে:

    • কার্যক্রম শুরু: ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই নতুন ব্যাংকটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করবে।
    • প্রধান কার্যালয়: ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছে রাজধানীর মতিঝিলের সেনা কল্যাণ ভবনে। এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় একটি চলতি হিসাব খোলা হয়েছে।
    • পরিচালনা পর্ষদ: পর্ষদ হবে সাত সদস্যের। বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। নতুন চেয়ারম্যান পদে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। পর্ষদের অন্যান্য সদস্যরা হলেন সরকারি বিভিন্ন বিভাগীয় সচিব ও যুগ্ম সচিবরা।
    • স্বতন্ত্র পরিচালক ও এমডি নিয়োগ: পেশাদার ব্যাংকার, হিসাববিদ এবং আইনজীবী সমানসংখ্যক স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পাবেন। ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগের জন্য সরকারের পরামর্শক্রমে সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন করা হবে।
    • শাখা সংকোচন: ব্যাংকগুলোর পরিচালন খরচ কমাতে একই এলাকার একাধিক শাখা একীভূত করে একটি বা দুটি করা হবে। সারা দেশে এসব ব্যাংকের ৭৬০টি শাখা, ৬৯৮টি উপশাখা এবং ৯৭৫টি এটিএম বুথ রয়েছে।

    এই একীভূতকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করছে, ইসলামি ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।