সরকারি সিকিউরিটিজে প্রাথমিক ডিলারদের তালিকাভুক্তি ও পরিচালনা নির্দেশিকা, ২০২৫

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সম্প্রতি “Guidelines for the Enlistment and Operations of Primary Dealers in Government Securities, 2025 (Amended)” জারি করেছে। এই নির্দেশিকাটি সরকারি সিকিউরিটিজের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বাজারকে আরও শক্তিশালী, স্বচ্ছ এবং কার্যকর করার লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে। নিচে এই নির্দেশিকার মূল দিকগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

সরকারি সিকিউরিটিজ

সরকারি সিকিউরিটিজ হলো বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ইস্যুকৃত বিনিময়যোগ্য ঋণ উপকরণ (Tradable debt instruments), যা ‘সরকারি ঋণ আইন, ২০২২’-এর অধীনে ইস্যু করা হয় । জাতীয় বাজেটের ঘাটতি অর্থায়নের জন্য অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে এগুলো ব্যবহৃত হয় ।

উৎসসমূহ অনুযায়ী, সরকারি সিকিউরিটিজের প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

১. সরকারি সিকিউরিটিজের প্রকারভেদ

বাংলাদেশ সরকার মূলত দুই ধরনের সিকিউরিটিজ ইস্যু করে থাকে:

ট্রেজারি বিল (Treasury Bill): এগুলো স্বল্পমেয়াদী সিকিউরিটিজ, যার মেয়াদ সাধারণত এক বছর বা তার কম হয়ে থাকে।

ট্রেজারি বন্ড (Treasury Bond): এগুলো দীর্ঘমেয়াদী সিকিউরিটিজ, যার মেয়াদ এক বছরের বেশি হয়।

২. বাজারের কাঠামো

সরকারি সিকিউরিটিজের লেনদেন প্রধানত দুটি স্তরে সম্পন্ন হয়:

প্রাথমিক বাজার (Primary Market): যেখানে সরকার সরাসরি নিলাম বা নির্দিষ্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের কাছে সিকিউরিটিজ ইস্যু করে।

মাধ্যমিক বাজার (Secondary Market): যেখানে একবার ইস্যুকৃত সিকিউরিটিজসমূহ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে পুনরায় কেনাবেচা হয়। এটি বাজারে তারল্য বা লিকুইডিটি নিশ্চিত করে।

৩. প্রাথমিক ডিলারদের (Primary Dealers) ভূমিকা

সরকারি সিকিউরিটিজ বাজারের প্রাণকেন্দ্র হলো প্রাথমিক ডিলার বা পিডি [১১]। তারা ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিম্নলিখিত দায়িত্ব পালন করে:

• নিলামের মাধ্যমে সরকারের কাছ থেকে সরাসরি সিকিউরিটিজ ক্রয় করার বাধ্যতামূলক বিডিং (Bidding Obligation) পালন করে।

• মাধ্যমিক বাজারে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের জন্য প্রতিনিয়ত মূল্য (Two-way Price) প্রদান করে মার্কেট মেকার হিসেবে কাজ করে।

• বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সরকারি সিকিউরিটিজ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করে।

পটভূমি ও উদ্দেশ্য

জাতীয় বাজেট অর্থায়নের জন্য অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহে সরকারি সিকিউরিটিজ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একটি দক্ষ ও তারল্যসমৃদ্ধ বাজার নিশ্চিত করতে প্রাথমিক ডিলারদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৩ সালের বিদ্যমান নির্দেশিকা সংশোধন করে বাজার পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০২৫ সালের এই নতুন নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হয়েছে।

এই নির্দেশিকার প্রধান উদ্দেশ্যগুলো হলো:

  • প্রাথমিক ডিলার সিস্টেমের জন্য একটি কার্যকর ও স্বচ্ছ পরিচালনা কাঠামো তৈরি করা
  • বাধ্যতামূলক বিডিংয়ের মাধ্যমে সরকারি সিকিউরিটিজের সফল ইস্যু নিশ্চিত করা
  • বাজারে তারল্য বৃদ্ধি এবং সঠিক মূল্য নির্ধারণে সহায়তা করা
  • বিনিয়োগকারীর ভিত্তি বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময় করা

প্রাথমিক ডিলার হিসেবে নিয়োগের যোগ্যতা

বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে পরামর্শ করে অর্থ বিভাগ ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাথমিক ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেবে।

আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় শর্তাবলী:

  • সরকারি সিকিউরিটিজের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বাজারে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের আগ্রহ
  • ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা, লেনদেন নিষ্পত্তি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা
  • দক্ষ জনবল এবং আধুনিক আইটি অবকাঠামো
  • পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতা, যেমন ক্যামেলস রেটিং, মূলধনের পর্যাপ্ততা ও সামগ্রিক কমপ্লায়েন্স

এছাড়াও, নির্দেশিকায় “Standalone Primary Dealer” ধারণা যুক্ত করা হয়েছে, যারা আমানত গ্রহণ বা সাধারণ ব্যাংকিং কার্যক্রমে যুক্ত না থেকে শুধুমাত্র সরকারি সিকিউরিটিজ ট্রেডিং ও মার্কেট মেকার হিসেবে কাজ করবে।

প্রাথমিক ডিলারদের প্রধান বাধ্যবাধকতা

প্রাথমিক ডিলারদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক উভয় বাজারে নির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা পালন করতে হবে।

প্রাথমিক বাজারের বাধ্যবাধকতা:

  • প্রতিটি নিলামে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে হবে
  • মোট বিডিং বাধ্যবাধকতার ৬০ শতাংশ নির্ধারিত হবে সংশ্লিষ্ট ডিলারের মোট আমানত ও দায়ের ভিত্তিতে এবং বাকি ৪০ শতাংশ সকল ডিলারের মধ্যে সমানভাবে বণ্টন করা হবে
  • ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ন্যূনতম ৬০ শতাংশ সাকসেস রেশিও বজায় রাখতে হবে

মাধ্যমিক বাজারের বাধ্যবাধকতা:

  • প্রতিটি কার্যদিবসে সক্রিয় ডিলিং ডেস্ক পরিচালনা করতে হবে
  • বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত সিকিউরিটিজের জন্য নিয়মিত দুইমুখী মূল্য প্রদান করতে হবে
  • সরকারি সিকিউরিটিজ হোল্ডিংয়ের অন্তত ২০ শতাংশ ট্রেডিং বুক হিসেবে সংরক্ষণ করতে হবে
  • বাৎসরিক বিডিং বাধ্যবাধকতার ভিত্তিতে নির্ধারিত ন্যূনতম বাৎসরিক টার্নওভার নিশ্চিত করতে হবে

প্রাথমিক ডিলারদের সুযোগ-সুবিধা ও বিশেষ অধিকার

দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রাথমিক ডিলাররা কিছু বিশেষ সুবিধা ভোগ করবেন:

  • নিজেদের অ্যাকাউন্টে এবং নির্দিষ্ট গ্রাহকদের পক্ষে সফল বিডের ওপর কমিশন প্রাপ্তি
  • সরকারের দায় ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম যেমন বাই-ব্যাক ও এক্সচেঞ্জ কার্যক্রমে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ
  • সরকারি সিকিউরিটিজ লেনদেনের জন্য সিকিউরিটিজ লেন্ডিং সুবিধা ব্যবহারের সুযোগ

কর্মক্ষমতা মূল্যায়ন ও স্টার পারফর্মার নির্বাচন

অর্থ বিভাগ প্রতি বছর বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রাথমিক ডিলারদের কর্মক্ষমতা মূল্যায়ন করবে। এই মূল্যায়নে পরিমাণগত সূচকের গুরুত্ব থাকবে ৮০ শতাংশ এবং গুণগত সূচকের গুরুত্ব থাকবে ২০ শতাংশ।

বার্ষিক মূল্যায়নে শীর্ষ তিনটি প্রাথমিক ডিলারকে স্টার পারফর্মার হিসেবে ঘোষণা করা হবে। তারা সম্মাননা পত্রের পাশাপাশি পরবর্তী এক বছরের জন্য সাধারণ হারের চেয়ে বেশি কমিশন পাওয়ার যোগ্য হবেন।

তদারকি ও বাতিলকরণ প্রক্রিয়া

বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিতভাবে প্রাথমিক ডিলারদের নথিপত্র ও সিস্টেম পরিদর্শন করতে পারবে। কোনো ডিলার নির্দেশিকা লঙ্ঘন করলে বা ধারাবাহিকভাবে সন্তোষজনক কর্মক্ষমতা প্রদর্শনে ব্যর্থ হলে অর্থ বিভাগ তাদের সদস্যপদ স্থগিত বা বাতিল করতে পারবে। এছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান চাইলে নির্ধারিত সময় আগে নোটিশ দিয়ে স্বেচ্ছায় প্রাথমিক ডিলার কার্যক্রম থেকে সরে যেতে পারবে।

উপসংহার

সরকারি সিকিউরিটিজ নির্দেশিকা, ২০২৫ বাংলাদেশের বন্ড মার্কেট উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি প্রাথমিক ডিলারদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের আর্থিক বাজারের স্থিতিশীলতা ও গভীরতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রাথমিক ডিলারদের পেশাদারিত্ব ও সক্রিয় অংশগ্রহণই এই নির্দেশিকার সফল বাস্তবায়নের মূল চাবিকাঠি।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *