দীর্ঘমেয়াদী সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক শেয়ার বাজার বা রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগের চেয়ে নিজের ওপর বিনিয়োগ বা আত্ম-উন্নয়ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ পাওয়া যায়:
- আয়ের সীমাবদ্ধতা কাটানো: যদি কেউ খুব সামান্য অর্থ দিয়ে শুরু করে, তবে মাসে অল্প কিছু টাকা ইনডেক্স ফান্ডে বিনিয়োগ করে দ্রুত দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয় । চার্লি মাঙ্গারের মতে, এই অবস্থায় বিনিয়োগের চেয়ে উপার্জন ক্ষমতা বাড়ানো জরুরি । নিজের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বর্তমান আয় এবং লক্ষ্যমাত্রার আয়ের মধ্যকার ব্যবধান ঘুচিয়ে ফেলাই হলো সেরা বিনিয়োগ ।
- সর্বোচ্চ রিটার্ন (High ROI): আত্ম-উন্নয়নে বিনিয়োগ করলে যে রিটার্ন পাওয়া যায়, তা অন্য যেকোনো বিনিয়োগের চেয়ে অনেক বেশি । উদাহরণস্বরূপ, যদি ২,০০০ ডলার খরচ করে এমন কোনো দক্ষতা বা সার্টিফিকেট অর্জন করা যায় যা ঘণ্টায় আয় ২০ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৩৫ ডলারে নিয়ে যায়, তবে সেই বিনিয়োগ থেকে বছরে ৭৫০% পর্যন্ত রিটার্ন পাওয়া সম্ভব ।
- উৎপাদনের উপায় নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা: নিজের দক্ষতা ও সরঞ্জামের ওপর বিনিয়োগ করলে একজন ব্যক্তি স্বাধীনভাবে অর্থ উপার্জনের পথ তৈরি করতে পারেন । এর ফলে তিনি কেবল অন্যের চাকরির ওপর নির্ভর না থেকে নিজের আয়ের উৎস নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন ।
- ভুল সময়ে বিনিয়োগের ঝুঁকি এড়ানো: পর্যাপ্ত আপদকালীন তহবিল (emergency fund) এবং শক্তিশালী আয়ের উৎস তৈরি করার আগেই বিনিয়োগ শুরু করলে বিপদের সময় (যেমন: অসুস্থতা বা গাড়ি নষ্ট হওয়া) লোকসানে বিনিয়োগ বিক্রি করে দিতে হতে পারে । আত্ম-উন্নয়নের মাধ্যমে আয় বাড়িয়ে আগে একটি মজবুত আর্থিক ভিত্তি বা ‘ইমার্জেন্সি ওয়াল’ তৈরি করা প্রয়োজন ।
- নেটওয়ার্কিং ও সুযোগ সৃষ্টি: নিজের অবস্থান উন্নত করতে সঠিক মানুষের সাথে যোগাযোগ এবং পেশাদার গ্রুপে যোগ দেওয়া জরুরি [১৩]। মাঙ্গারের মতে, জীবনের বড় বড় আর্থিক সুযোগগুলো প্রায়শই সঠিক সময়ে সঠিক মানুষের সাথে পরিচয়ের মাধ্যমে আসে ।
- ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের সক্ষমতা তৈরি: প্রথম বছরটি মূলত নিজেকে দক্ষ করে তোলা এবং ভিত্তি তৈরির বছর (Defense) । এই সময়ে আত্ম-উন্নয়ন করলে দ্বিতীয় বছর থেকে অনেক বেশি আক্রমণাত্মকভাবে (Offense) এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে বড় বড় বিনিয়োগ করা সম্ভব হয় ।
সংক্ষেপে, সূত্র অনুযায়ী, শুরুতে টাকা বিনিয়োগ করার চেয়ে নিজের উপার্জনের ক্ষমতা বাড়ানো এবং জ্ঞান অর্জন করা দীর্ঘমেয়াদী সম্পদ তৈরির সবচেয়ে কার্যকর ও লাভজনক উপায় ।
আয় বাড়ানোর জন্য কোন ধরনের দক্ষতা অর্জন করা সবচেয়ে লাভজনক?
আয় বাড়ানোর জন্য সবচেয়ে লাভজনক দক্ষতা হলো সেগুলো, যা আপনার ঘণ্টাপ্রতি আয়ের হার (hourly rate) উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে পারে এবং আপনার বর্তমান আয়ের সাথে লক্ষ্যমাত্রার আয়ের ব্যবধান কমিয়ে দেয়। নির্দিষ্ট কোনো একটি দক্ষতা নয়, বরং আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী এমন দক্ষতা বেছে নেওয়া উচিত যার বাজারে উচ্চ চাহিদা রয়েছে।
নিচে আয় বাড়ানোর জন্য সবচেয়ে কার্যকর ও লাভজনক দক্ষতাগুলোর একটি তালিকা দেওয়া হলো:
• উচ্চ-মূল্যের কারিগরি ও পেশাদার দক্ষতা:
আপনার আয় যদি ঘণ্টায় ২০ ডলার হয়, তবে এমন কোনো দক্ষতা অর্জন করা উচিত যা আপনার আয়কে ঘণ্টায় ৩৫ ডলারে নিয়ে যাবে। যেমন:
◦ কোডিং বা সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট: এটি বর্তমান সময়ে অন্যতম লাভজনক দক্ষতা।
◦ রিয়েল এস্টেট লাইসেন্স: এটি পেশাদারী আয়ের একটি শক্তিশালী পথ খুলে দেয়।
• যোগাযোগ ও বিক্রয় সংক্রান্ত দক্ষতা (Communication and Sales):
চার্লি মাঙ্গারের মতে, সরাসরি অর্থ উপার্জনের জন্য কিছু দক্ষতা অত্যন্ত কার্যকর:
◦ কপিরাইটিং: লেখার মাধ্যমে পণ্য বা সেবার বিক্রি বাড়ানো।
◦ কোল্ড কলিং ও সেলস: স্পষ্ট ও আত্মবিশ্বাসী যোগাযোগের মাধ্যমে কমিশনভিত্তিক আয়।
◦ গ্রাফিক ডিজাইন: ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে জনপ্রিয় আয় উৎস।
• স্বাধীনভাবে কাজ করার দক্ষতা:
এমন দক্ষতা সবচেয়ে লাভজনক যা আপনাকে অন্যের ওপর নির্ভর না করে উৎপাদনের উপায় নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। যেমন, ভালো ল্যাপটপ ব্যবহার করে লেখালেখি করা বা মানসম্মত সরঞ্জাম দিয়ে কিছু তৈরি করা।
• নেটওয়ার্কিং এবং পজিশনিং:
যদিও এটি সরাসরি কোনো প্রযুক্তিগত দক্ষতা নয়, তবে সঠিক মানুষের সাথে সম্পর্ক তৈরি করা এবং পেশাদার গ্রুপে যুক্ত হওয়াকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হিসেবে দেখা হয়। মাঙ্গারের মতে, জীবনের বড় আর্থিক সুযোগগুলো প্রায়শই সঠিক সময়ে সঠিক মানুষের সাথে পরিচয়ের মাধ্যমেই আসে।
এই ধরনের দক্ষতায় বিনিয়োগ করলে বছরে বহু গুণ বেশি রিটার্ন পাওয়া সম্ভব, যা শেয়ার বাজার বা অন্যান্য বিনিয়োগের তুলনায় অনেক বেশি লাভজনক হতে পারে। শুরুতে লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন দক্ষতা তৈরি করা, যা দিয়ে দ্রুত মূলধন (capital) জমা করা যায়।
আয় বাড়ানোর জন্য একাধিক আয়ের উৎস কীভাবে তৈরি করবেন?
দক্ষতা বৃদ্ধিতে কি খুব বেশি অর্থের প্রয়োজন হয়?
দক্ষতা উন্নয়নের পর প্রথম বড় বিনিয়োগ কোথায় করা উচিত?
দক্ষতা বৃদ্ধিতে ৫,০০০ ডলার বিনিয়োগ করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাটি কী?
দক্ষতা ও উপার্জন ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ৫,০০০ ডলার বিনিয়োগের একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিচে দেওয়া হলো। এই বিনিয়োগের লক্ষ্য হলো বর্তমান আয়ের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে দীর্ঘমেয়াদী সম্পদের ভিত্তি তৈরি করা।
১. উপার্জন বৃদ্ধিকারী দক্ষতা অর্জন (২,০০০ ডলার):
এই অর্থ এমন কোনো সার্টিফিকেট বা প্রশিক্ষণে ব্যয় করতে হবে যা সরাসরি আপনার ঘণ্টাপ্রতি আয়ের হার বাড়িয়ে দেয়। উদাহরণস্বরূপ: কোডিং বুটক্যাম্প, রিয়েল এস্টেট লাইসেন্স বা ট্রাক ড্রাইভিং CDL। যদি ২,০০০ ডলার ব্যয় করে ঘণ্টায় আয় ২০ ডলার থেকে ৩৫ ডলারে নেওয়া যায়, তবে সেটি অত্যন্ত উচ্চ রিটার্ন নিশ্চিত করে।
২. উৎপাদনের সরঞ্জাম ক্রয় (১,০০০ ডলার):
স্বাধীনভাবে অর্থ উপার্জনের জন্য প্রয়োজনীয় টুলস বা সরঞ্জাম কিনতে এই অর্থ ব্যবহার করতে হবে। যেমন: ভালো মানের ল্যাপটপ ও সফটওয়্যার, মানসম্মত নির্মাণ সরঞ্জাম বা বিক্রির জন্য প্রাথমিক ইনভেন্টরি। লক্ষ্য হলো নিজের আয়ের উৎসের মালিকানা নিজের হাতে রাখা।
৩. নেটওয়ার্কিং এবং পজিশনিং (১,০০০ ডলার):
এই অর্থ ব্যয় করতে হবে পেশাদার কনফারেন্সে অংশগ্রহণ, ইন্ডাস্ট্রি গ্রুপে সদস্যপদ গ্রহণ বা কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে থাকা সফল ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাতে। জীবনের বড় আর্থিক সুযোগগুলো প্রায়শই এই নেটওয়ার্ক থেকেই আসে।
৪. সুযোগ তহবিল বা অপরচুনিটি ফান্ড (১,০০০ ডলার):
এই অর্থ নগদ রেখে দিতে হবে হঠাৎ আসা সুযোগের জন্য। যেমন: সস্তায় পণ্য কিনে পুনরায় বিক্রি করা বা জরুরি ভিত্তিতে ফ্রিল্যান্সিং সরঞ্জাম কেনা।
এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো শেয়ার বাজার বা রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগের আগে নিজের উপার্জন ক্ষমতা বাড়ানো এবং আয়ের ব্যবধান কমিয়ে আনা। এভাবে বিনিয়োগ করলে কয়েক মাসের মধ্যেই আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা সম্ভব।