সরকারি ঋণ আইন, ২০২২: আর্থিক ব্যবস্থাপনায় যুগান্তকারী পদক্ষেপ

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সরকারি ঋণ গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ এবং যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে ‘সরকারি ঋণ আইন, ২০২২’ প্রণয়ন করা হয়েছে। ২০২২ সালের ৭ সেপ্টেম্বর তারিখে এই আইনটি রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করে এবং কার্যকর হয় । দীর্ঘদিনের পুরনো ‘Public Debt Act, 1944’ রহিত করে বর্তমান সময়ের প্রয়োজন ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এই নতুন আইনটি আনা হয়েছে ।

নিচে এই আইনের প্রধান দিকগুলো এবং এর বিভিন্ন ধারা ও উপধারার বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো:

১. আইনের প্রেক্ষাপট ও প্রয়োজনীয়তা

১৯৪৪ সালের ব্রিটিশ আমলের সরকারি ঋণ আইনটি বর্তমান সময়ের জটিল আর্থিক লেনদেন ও ব্যবস্থাপনার জন্য যথেষ্ট ছিল না। বিশেষ করে শরীয়াহভিত্তিক বিনিয়োগ (সুকুক), সার্বভৌম বন্ড এবং আধুনিক ঋণ ব্যবস্থাপনা কাঠামোর অভাব ছিল পুরনো আইনে। উৎসসমূহ অনুযায়ী, পুরনো আইনটি রহিত করে একে সময়োপযোগী করার উদ্দেশ্যেই ২০২২ সালের এই ১৭ নং আইনটি পাস করা হয় । এই আইনের একটি বিশেষ দিক হলো, আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যা-ই থাকুক না কেন, এই আইনের বিধানাবলি প্রাধান্য পাবে ।

২. গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞাসমূহ

আইনটি সঠিকভাবে বোঝার জন্য এর আওতায় সংজ্ঞায়িত কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা জানা জরুরি :

  • জাতীয় সঞ্চয় স্কিম: জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর কর্তৃক ইস্যু করা যেকোনো সঞ্চয় স্কিম ।
  • ট্রেজারি বন্ড ও ট্রেজারি বিল: ১ বছরের বেশি মেয়াদের সরকারি সিকিউরিটিজ হলো ‘ট্রেজারি বন্ড’ এবং ১ বছরের কম মেয়াদের সিকিউরিটিজ হলো ‘ট্রেজারি বিল’ ।
  • সরকারি সিকিউরিটিজ: সরকারি ঋণ প্রাপ্তির বিপরীতে বা শরীয়াহসম্মত পদ্ধতিতে বিনিয়োগ গ্রহণের উদ্দেশ্যে ইস্যু করা দলিল। এর মধ্যে প্রোমিসরি নোট, বেয়ারার বন্ড এবং সুকুক (শরীয়াহসম্মত বিনিয়োগ) অন্তর্ভুক্ত ।
  • রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি: কোনো স্বায়ত্তশাসিত বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কর্তৃক গৃহীত ঋণের বিপরীতে সরকার যখন ঋণ পরিশোধের নিশ্চয়তা প্রদান করে ।
  • স্পেশাল পারপাস ভেহিকল (SPV): বিশেষ করে সুকুক বা শরীয়াহভিত্তিক সিকিউরিটিজ ইস্যু করার জন্য সরকার কর্তৃক গঠিত বিশেষ সত্তা ।

৩. সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা কাঠামো (অফিস বিভাজন)

উৎসসমূহ অনুযায়ী, সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনাকে তিনটি প্রধান স্তরে বা অফিসে ভাগ করা হয়েছে, যা আধুনিক ‘ডেবট ম্যানেজমেন্ট’ বা ঋণ ব্যবস্থাপনার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ :

  • ফ্রন্ট অফিস (Front Office): এই অফিসের কাজ হলো ঋণদাতাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করা, আলোচনা করা এবং ঋণ গ্রহণের কার্যক্রম সম্পন্ন করা [৪]।
  • মিডল অফিস (Middle Office): এখানে ঋণের ঝুঁকি নিরূপণ করা হয়, ঋণ পরিকল্পনা ও কৌশল প্রণয়ন করা হয় এবং বিভিন্ন অফিসের মধ্যে সমন্বয় করা হয় । অর্থ বিভাগ মূলত এই মিডল অফিস হিসেবে কাজ করে ।
  • ব্যাক অফিস (Back Office): এই অফিসের কাজ হলো ঋণের হিসাবায়ন, সমন্বয় এবং ঋণ সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করা [৫]।

৪. বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ভূমিকা

আইন অনুযায়ী, সরকারি ঋণের বিভিন্ন দিক পরিচালনার জন্য আলাদা আলাদা দপ্তরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে [১৩, ১৪, ১৫]:

  • অর্থ বিভাগ (অর্থ মন্ত্রণালয়): ঋণ নীতি প্রণয়ন, সার্বভৌম বন্ড ইস্যু করা এবং রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি হিসাবায়নের কাজ করে ।
  • অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ERD): বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ সংগ্রহ, ঋণের হিসাব সংরক্ষণ এবং ঋণ পরিশোধের (Debt Servicing) দায়িত্ব পালন করে ।
  • বাংলাদেশ ব্যাংক: সরকারের পক্ষ থেকে সরকারি সিকিউরিটিজ ইস্যু করে স্থানীয় ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ করে এবং এর ব্যাক ও ফ্রন্ট অফিসের দায়িত্ব পালন করে ।
  • জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর: সরকারের বাজেট অনুযায়ী বিভিন্ন সঞ্চয় স্কিমের মাধ্যমে জনগণের কাছ থেকে বিনিয়োগ গ্রহণ ও ব্যবস্থাপনা করে ।
  • হিসাব মহানিয়ন্ত্রক কার্যালয় (CAG): এটি সামগ্রিক সরকারি ঋণের হিসাব সংরক্ষণ ও আসল-মুনাফা পরিশোধের হিসাবায়নের কাজ করে ।

৫. ঋণ সংগ্রহ ও রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি

আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী, সরকার বাজেট ঘাটতি মেটানোর জন্য বা অন্য কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে দেশীয় ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ বা বিনিয়োগ সংগ্রহ করতে পারবে । তবে সরকার কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় বা বিভাগ ব্যতীত অন্য কেউ সরকারের পক্ষে ঋণ সংগ্রহ করতে পারবে না ।

রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি বা কাউন্টার গ্যারান্টি প্রদানের ক্ষমতা কেবল অর্থ বিভাগ এর হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে । এই গ্যারান্টিগুলোকে সরকারের ‘আপৎকালীন দায়’ (Contingent Liability) হিসেবে গণ্য করা হবে এবং প্রতি বছর বাজেটের সাথে এর একটি হিসাব জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করতে হবে । সরকার এই দায়ের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বার্ষিক একটি উর্ধ্বসীমা (Ceiling) নির্ধারণ করতে পারবে ।

৬. সরকারি সিকিউরিটিজ হস্তান্তর ও মালিকানা

সরকারি সিকিউরিটিজ নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করে হস্তান্তর করা যায় । তবে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যেমন সিকিউরিটিজ যদি হস্তান্তরযোগ্য না হয় অথবা সরকারের বিধির সাথে সাংঘর্ষিক হয় তবে তা বৈধ হবে না ।

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকার যেকোনো সরকারি কার্যালয়কে সিকিউরিটিজের ধারক হওয়ার অনুমতি দিতে পারে । এক্ষেত্রে কার্যালয়ের নাম পরিবর্তন হলে বা নতুন প্রধান এলে আলাদা কোনো দলিলের প্রয়োজন হবে না । কোনো প্রতিষ্ঠান যদি দেউলিয়া হয়ে যায় বা বিলুপ্ত হয়, তবে আদালত নিযুক্ত প্রশাসক বা লিকুইডেটর সেই প্রতিষ্ঠানের সিকিউরিটিজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে পারবেন ।

৭. মনোনয়ন (Nomination) ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিধান

উৎসসমূহে সঞ্চয়কারী বা সিকিউরিটিজ ধারকদের জন্য মনোনয়ন প্রদানের বিস্তারিত প্রক্রিয়া বর্ণিত হয়েছে :

  • মনোনয়ন: একজন ধারক এক বা একাধিক ব্যক্তিকে নমিনি হিসেবে মনোনীত করতে পারেন ।
  • ধারকের মৃত্যু: ধারকের মৃত্যুর পর নমিনি নির্ধারিত পদ্ধতিতে পাওনা অর্থ গ্রহণ করতে পারবেন । যদি নমিনি নাবালক হয়, তবে ধারক তার পরিবর্তে অর্থ গ্রহণের জন্য কোনো প্রতিনিধি নিয়োগ করতে পারেন ।
  • উত্তরাধিকার সনদ: যদি কোনো সঞ্চয় বা সিকিউরিটিজের পরিমাণ ১ লক্ষ টাকার বেশি না হয় এবং ধারক কোনো উইল বা উত্তরসূরি রেখে না যান, তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বা সঞ্চয় অধিদপ্তর তদন্ত সাপেক্ষে পাওনাদার নির্ধারণ করতে পারে । তবে ১ লক্ষ টাকার বেশি হলে ‘Succession Act, 1925’ অনুযায়ী উত্তরাধিকার সনদের প্রয়োজন হয় ।

৮. বিরোধ নিষ্পত্তি ও আইনি সুরক্ষা

যদি সরকারি সিকিউরিটিজের মালিকানা নিয়ে একাধিক ব্যক্তির মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়, তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বা সঞ্চয় অধিদপ্তর তদন্তের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে । শুনানির পর সিদ্ধান্ত নিলে এবং তা গেজেটে প্রকাশিত হলে ৬ মাস পর সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আদেশ জারি করা হবে ।

এই আইনের অধীনে গৃহীত কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সহজে মামলা করা যাবে না। বিশেষ করে, সরকারের পক্ষ থেকে আসল বা মুনাফা পরিশোধের ক্ষেত্রে সরকার দায়মুক্ত থাকবে যদি তা যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ করে করা হয় । এছাড়া, মুনাফা বা পাওনা অর্থ আদায়ের দাবি করার জন্য ৬ বছরের একটি তামাদি সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার পর সরকার আর দায়ী থাকবে না ।

৯. দণ্ড ও অপরাধ

আইনটি কঠোরভাবে পালনের জন্য শাস্তির বিধানও রাখা হয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তি নিজের বা অন্যের নামে সিকিউরিটিজের স্বত্ব পাওয়ার জন্য কোনো মিথ্যা তথ্য বা বিবৃতি প্রদান করেন, তবে তিনি অনধিক ৬ মাস কারাদণ্ড অথবা অনধিক ১ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন । বাংলাদেশ ব্যাংক বা সঞ্চয় অধিদপ্তরের অভিযোগ ব্যতীত কোনো আদালত এই অপরাধ আমলে নেবে না ।

১০. অন্যান্য বিশেষ বিধান

  • শপথ গ্রহণের ক্ষমতা: তদন্তের প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংক বা সঞ্চয় অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ বা শপথ পাঠ করানোর ক্ষমতা রাখেন ।
  • গোপনীয়তা ও পরিদর্শন: তথ্য অধিকার আইনের অধিকার ক্ষুণ্ণ না করে, সরকারি সিকিউরিটিজ সংক্রান্ত নথিপত্র পরিদর্শনের জন্য নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও ফি প্রযোজ্য হবে ।
  • ইংরেজি পাঠ: এই আইনের একটি নির্ভরযোগ্য ইংরেজি পাঠ সরকার প্রকাশ করতে পারবে, তবে বাংলা ও ইংরেজি পাঠের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে বাংলা পাঠই প্রাধান্য পাবে ।

উপসংহার

সরকারি ঋণ আইন, ২০২২ কেবল একটি আইনি দলিল নয়, বরং এটি বাংলাদেশের আর্থিক সার্বভৌমত্ব ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। এটি সরকারকে যেমন সুশৃঙ্খলভাবে ঋণ গ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছে, তেমনি সাধারণ বিনিয়োগকারী ও সঞ্চয়কারীদের স্বার্থ রক্ষায় স্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছে । বিশেষ করে সুকুক এবং আধুনিক ঋণ অফিস কাঠামোর অন্তর্ভুক্তি আমাদের অর্থনীতিকে বৈশ্বিক মানদণ্ডে উন্নীত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এই আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে।

Leave a comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।