সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রথম বিনিয়োগ

বাংলাদেশের ইসলামি ব্যাংকিং খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক স্থাপিত হলো সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি-এর প্রথম বিনিয়োগের মাধ্যমে। ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ব্যাংকটি তার কার্যক্রমের শুরুর দিনগুলিতে ১০ বছর মেয়াদি Bangladesh Government Special Sukuk-1-এ বিনিয়োগ করে, যা দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

একক ব্যাংকের সর্ববৃহৎ সরকারি সুকুক বিনিয়োগ

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি উক্ত সুকুকে ১০,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে, যা সরকারি সুকুকে একক কোনো ব্যাংকের এ যাবতকালের সর্ববৃহৎ বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকটি শুধু তার আর্থিক সক্ষমতারই পরিচয় দেয়নি, বরং রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণের একটি শক্ত অবস্থানও তৈরি করেছে।

বিনিয়োগের পটভূমি ও প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্টের অধীন গঠিত ‘শরীয়াহ্ এডভাইজরি কমিটি’-এর সভায় এই সুকুক ইস্যুর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় গত ৭ ও ৮ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত সভায় কমিটির সদস্যদের সম্মতিক্রমে Ijarah (ইজারা) পদ্ধতিতে এই সুকুক ইস্যুর অনুমোদন দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ, আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া-এর হাতে সুকুক ইস্যুর সার্টিফিকেট হস্তান্তর করেন। এ সময় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্টের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

সুকুক বিনিয়োগের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ

এই বিশেষ বিনিয়োগের বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য দিক রয়েছে:

বিনিয়োগের পরিমাণ ও মেয়াদ: ব্যাংকটি মোট ১০,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে যার মেয়াদকাল নির্ধারিত হয়েছে ১০ বছর

আন্ডারলাইং অ্যাসেট (সম্পদ): এই সুকুকটি মূলত গণপূর্ত অধিদপ্তর কর্তৃক নির্মিত সরকারি কর্মচারীদের ৭টি আবাসন প্রকল্প এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের সুনির্দিষ্ট রেল সেবার বিপরীতে ইস্যু করা হয়েছে ।

মুনাফার হার: বিনিয়োগের বিপরীতে ব্যাংকটি বার্ষিক ৯.৭৫% হারে মুনাফা লাভ করবে, যা প্রতি ছয় মাস অন্তর (ষাণ্মাসিক ভিত্তিতে) প্রদান করা হবে ।

ইস্যু পদ্ধতি: এটি Private Placement-এর মাধ্যমে সরাসরি ব্যাংকের অনুকূলে ইস্যু করা হয়েছে ।

এই বিনিয়োগের গুরুত্ব

‘বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট স্পেশাল সুকুক-১’ (Bangladesh Government Special Sukuk-1)-এ ১০,০০০ কোটি টাকার এই বিশাল বিনিয়োগ সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বহুমুখী প্রভাব ফেলবে ।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি-এর ওপর প্রভাব:

আর্থিক ভিত্তি সুদৃঢ়করণ: এই সুকুক থেকে ব্যাংকটি বার্ষিক ৯.৭৫% হারে মুনাফা পাবে যা প্রতি ছয় মাস অন্তর প্রদেয় । এই নির্দিষ্ট আয়ের উৎস ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে।

তারল্য ব্যবস্থাপনা ও এসএলআর (SLR): বিনিয়োগকৃত সুকুকটি ব্যাংকটি বিধিবদ্ধ তারল্য (SLR) সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করতে পারবে । এছাড়া তারল্য সংকটের সময় এটি বাংলাদেশ ব্যাংক হতে তারল্য সুবিধা গ্রহণের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে । যেহেতু এটি একটি লেনদেনযোগ্য সিকিউরিটিজ, তাই ব্যাংক প্রয়োজনে যেকোনো সময় এর মালিকানা হস্তান্তর করে তারল্য সংগ্রহ করতে পারবে ।

নিরাপদ বিনিয়োগ ও ঝুঁকি হ্রাস: এটি একটি নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত, যা ব্যাংকের বিনিয়োগকৃত অর্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে । এর মাধ্যমে ব্যাংক তার বিনিয়োগ পোর্টফোলিওকে বহুমুখী করার সুযোগ পাবে ।

আমানতকারীদের আস্থা বৃদ্ধি: সম্পূর্ণ শরীয়াহসম্মত পদ্ধতিতে (Ijarah বা ইজারা) পরিচালিত এই বিনিয়োগটি ব্যাংকের প্রতি আমানতকারীদের আস্থা অর্জনে সহায়ক হবে ।

দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব:

অবকাঠামো ও সেবার উন্নয়ন: এই সুকুকের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহৃত হবে। বিশেষ করে, গণপূর্ত অধিদপ্তর কর্তৃক নির্মিত সরকারি কর্মচারীদের ৭টি আবাসন প্রকল্প এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের সুনির্দিষ্ট সেবা সমূহের উন্নয়নে এই বিনিয়োগ সরাসরি ভূমিকা রাখবে ।

ইসলামী বন্ড মার্কেটের বিকাশ: একক কোনো ব্যাংকের পক্ষ থেকে ১০,০০০ কোটি টাকার এই বিনিয়োগ সরকারি সুকুকের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ । এটি দেশে শরীয়াহভিত্তিক বিনিয়োগের পরিধি বাড়াতে এবং সরকারি অর্থায়নের উৎস হিসেবে ইসলামী বন্ডের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করবে।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা: বিশাল অংকের এই বিনিয়োগ দেশের ডেট ম্যানেজমেন্ট বা ঋণ ব্যবস্থাপনায় সরকারি সিকিউরিটিজের গুরুত্ব তুলে ধরে, যা দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হয় ।

এই সুকুক বিনিয়োগটি একদিকে যেমন ব্যাংকের জন্য একটি লাভজনক ও নিরাপদ সম্পদ হিসেবে কাজ করবে, অন্যদিকে সরকারি আবাসন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে অর্থায়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক অবদান রাখবে ।

কোন প্রকল্পের বিপরীতে এই সুকুক?

এই বিশেষ সুকুকটি Private Placement পদ্ধতিতে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি-এর অনুকূলে ইস্যু করা হয়। সুকুকটির বিপরীতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে—

  • গণপূর্ত অধিদপ্তর কর্তৃক নির্মিত সরকারি কর্মচারীদের ৭টি আবাসন প্রকল্প
  • বাংলাদেশ রেলওয়ের আওতায় পরিচালিত নির্দিষ্ট রেল সেবা

এই প্রকল্পগুলো বাস্তব, আয়ের সক্ষম এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সুকুকটি একটি শক্তিশালী ও নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

শরীয়াহসম্মত কাঠামো ও ইজারা পদ্ধতি

‘Bangladesh Government Special Sukuk-1’ ইস্যুর লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ-এর সভাপতিত্বে ডেট ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্টের অধীন গঠিত শরীয়াহ্ এডভাইজরি কমিটি দুইটি সভা আয়োজন করে। সভাগুলো অনুষ্ঠিত হয় যথাক্রমে ৭ জানুয়ারি ২০২৬৮ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে।

কমিটির সর্বসম্মত সিদ্ধান্তক্রমে ইজারা (Ijarah) পদ্ধতিতে ১০,০০০ কোটি টাকা মূল্যমানের ১০ বছর মেয়াদি সুকুক ইস্যুর অনুমোদন দেওয়া হয়, যেখানে বার্ষিক মুনাফার হার নির্ধারিত হয় ৯.৭৫%

আর্থিক সুবিধা ও তারল্য ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা

বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট স্পেশাল সুকুক-১-এ সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি-এর ১০,০০০ কোটি টাকার এই বৃহৎ বিনিয়োগ ব্যাংকের শরীয়াহভিত্তিক তারল্য ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপায়ে দীর্ঘমেয়াদী সহায়তা প্রদান করবে:

বিধিবদ্ধ তারল্য (SLR) সংরক্ষণ: এই সুকুক বিনিয়োগটি ব্যাংককে তার বিধিবদ্ধ তারল্য বা Statutory Liquidity Ratio (SLR) সংরক্ষণে সরাসরি সহায়তা করবে । এটি ব্যাংকের জন্য একটি স্থায়ী আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণের মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক হতে তারল্য সুবিধা গ্রহণ: কোনো জরুরি প্রয়োজনে বা তারল্য সংকটের সময় ব্যাংকটি এই সুকুক ব্যবহার করে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় তারল্য সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে ।

লেনদেনযোগ্য সিকিউরিটিজ: এই সুকুকটি একটি লেনদেনযোগ্য সিকিউরিটিজ হওয়ার ফলে তারল্য ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনে ব্যাংকটি যেকোনো সময় এর মালিকানা হস্তান্তর করে নগদ অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে । এটি ব্যাংকের তাৎক্ষণিক নগদ প্রবাহ বজায় রাখতে অত্যন্ত সহায়ক হবে।

নিরাপদ ও নিশ্চিত মুনাফা: ১০ বছর মেয়াদী এই সুকুক থেকে ব্যাংক প্রতি ছয় মাস অন্তর বার্ষিক ৯.৭৫% হারে মুনাফা লাভ করবে । এই নিয়মিত আয় ব্যাংকের আর্থিক অবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে সুদৃঢ় করবে এবং একটি স্থিতিশীল আয়ের উৎস নিশ্চিত করবে ।

শরীয়াহভিত্তিক বিনিয়োগ ও আমানতকারীদের আস্থা: সুকুকটি সম্পূর্ণ শরীয়াহসম্মত Ijarah (ইজারা) পদ্ধতিতে ইস্যু করা হয়েছে, যা গণপূর্ত অধিদপ্তরের আবাসন প্রকল্প এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের সেবার বিপরীতে পরিচালিত । শরীয়াহসম্মত নিরাপদ এই বড় বিনিয়োগটি ব্যাংকের প্রতি আমানতকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে, যা ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদী আমানত বা তারল্য স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।

বিনিয়োগের সুরক্ষা ও বহুমুখীকরণ: এটি একটি সরকারি ও নিরাপদ বিনিয়োগ হওয়ায় ব্যাংকের বিনিয়োগকৃত মূল অর্থ সুরক্ষিত থাকবে । এর মাধ্যমে ব্যাংক তার বিনিয়োগ খাতকে বহুমুখী করার সুযোগ পাবে, যা ঝুঁকি হ্রাসে এবং দীর্ঘমেয়াদী তারল্য ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করবে ।

সংক্ষেপে, এই বিনিয়োগটি একই সাথে ব্যাংকের আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণ, নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা এবং প্রয়োজনের সময় দ্রুত নগদ অর্থ সংগ্রহের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে ব্যাংকের সামগ্রিক তারল্য ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করবে।

আমানতকারীদের আস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

শরীয়াহসম্মত এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে নিরাপদ এই বিনিয়োগ সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি-এর প্রতি আমানতকারীদের আস্থা অর্জনে বিশেষভাবে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে বহুমুখী খাতে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করে ব্যাংকটির টেকসই প্রবৃদ্ধির পথ সুগম করবে।

উপসংহার

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি-এর প্রথম বিনিয়োগ হিসেবে ‘Bangladesh Government Special Sukuk-1’-এ ১০,০০০ কোটি টাকার অংশগ্রহণ শুধু একটি আর্থিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি দেশের ইসলামি ব্যাংকিং, সরকারি উন্নয়ন অর্থায়ন এবং শরীয়াহসম্মত বিনিয়োগ ব্যবস্থার জন্য একটি কৌশলগত ও দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ। এই বিনিয়োগ ভবিষ্যতে ব্যাংকটির শক্ত অবস্থান এবং দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

Leave a comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।