অর্থশূন্য থেকে বিলিয়নেয়ার: ২০২৬ সালের জন্য চার্লি মাঙ্গারের পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ

একেবারে শূন্য থেকে বিলিয়নেয়ার: ২০২৬ সালের জন্য চার্লি মাঙ্গারের পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ

যদি ২০২৬ সালের শুরুতে আপনার পকেটে এক টাকাও না থাকে, তবে চার্লি মাঙ্গারের মতে আপনার হতাশ হওয়ার বদলে উত্তেজিত হওয়া উচিত। কারণ, মাঙ্গার বিশ্বাস করেন যে একেবারে শূন্য থেকে শুরু করার তিনটি বিশাল সুবিধা রয়েছে যা ধনী ব্যক্তিদের নেই: ঝুঁকি নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা, কম খরচে ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ এবং দীর্ঘদিনের দারিদ্র্যের নেতিবাচক চক্র (negative compounding) থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ।

মাঙ্গার এই পথটি খুব ভালো করেই চেনেন। ১৯৬২ সালে ৩৮ বছর বয়সে তিনি নিঃস্ব ছিলেন, ঋণে ডুবে ছিলেন এবং তার ৯ বছরের ছেলে লিউকেমিয়ায় মারা যাচ্ছিল। সেই ধ্বংসস্তূপ থেকেই তিনি ২.৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ গড়েছিলেন। উৎস থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিচে ২০২৬ সালের জন্য তাঁর সেই ৭-ধাপের পরিকল্পনাটি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


ধাপ ১: জানুয়ারি — রক্তক্ষরণ বন্ধ করা (Stop the Bleeding)

সম্পদ তৈরির প্রথম শর্ত হলো—আপনার জীবনে টাকা আসার গতির চেয়ে বেরিয়ে যাওয়ার গতি বেশি হতে পারবে না। ১লা জানুয়ারি থেকেই আপনার খরচের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে।

  • খরচ অর্ধেক করা: প্রতিটি সাবস্ক্রিপশন এবং অভ্যাস যা টাকা নষ্ট করে, তা লিখে ফেলুন এবং খরচ অর্ধেক করে ফেলুন।
  • গাড়ির বিলাসিতা ত্যাগ: যদি গাড়ির কিস্তি থাকে, তবে তা বিক্রি করে দিয়ে নগদ টাকায় একটি পুরোনো সাধারণ গাড়ি (যেমন ৩,০০০ ডলারের হোন্ডা সিভিক) কিনুন। এতে প্রতি মাসে কিস্তি ও ইনস্যুরেন্স মিলিয়ে প্রায় ৫৫০ ডলার সাশ্রয় হবে।
  • বাইরে খাওয়া বন্ধ: বাইরের খাবার পুরোপুরি বন্ধ করে ঘরে সাধারণ খাবার (ডাল-ভাত-ডিম-সবজি) রান্না করুন। এটি বছরে আপনার প্রায় ৪,০০০ ডলার সাশ্রয় করতে পারে।
  • মানসিকতা বদলানো: গরিব থাকাকালীন বিলাসিতা পাওয়ার অধিকার আপনার নেই। মাঙ্গারের মতে, আপনার একমাত্র অধিকার হলো “গরিব না থাকা”, বাকি সব কিছুই বিলাসিতা যা আপনি এখনো অর্জন করেননি।

ধাপ ২: ফেব্রুয়ারি ও মার্চ — সর্বোচ্চ আয় করা (Maximum Income)

মাসিক ৫০ ডলার ইনডেক্স ফান্ডে রেখে আপনি দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাবেন না। এই ৬০ দিন আপনার একমাত্র লক্ষ্য হবে আয় বাড়ানো।

  • তিনটি কাজ করা: দিনের বেলা মূল চাকরি, সন্ধ্যায় ফ্রিল্যান্সিং এবং উইকএন্ডে অন্য কোনো ছোট কাজ করুন।
  • সাপ্তাহিক ৭০ ঘণ্টা কাজ: অবসাদ বা বার্নআউট-এর ভয়ে কাজ থামাবেন না। মাঙ্গার বলেন, ৩৫ বছর বয়সে কঠোর পরিশ্রম করা কষ্টের নয়, বরং ৭৫ বছর বয়সে অভাবের কারণে কাজ করতে বাধ্য হওয়া হলো আসল কষ্ট।
  • ৫,০০০ ডলার জমানো: ১লা এপ্রিলের মধ্যে ৫,০০০ ডলার জমানোর লক্ষ্য নিন। এটি আপনার মনে আত্মবিশ্বাস আনবে যে আপনি “বিনিয়োগকারী” হিসেবে ভাবছেন।

ধাপ ৩: এপ্রিল থেকে জুন — আপৎকালীন দেয়াল (Emergency Wall)

৫,০০০ ডলার জমানোর পর আপনার তা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করতে ইচ্ছে হবে। কিন্তু এখনই করবেন না।

  • ১৫,০০০ ডলারের লক্ষ্য: এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত আরও ১০,০০০ ডলার জমিয়ে মোট ১৫,০০০ ডলারের একটি ইমার্জেন্সি ওয়াল বা আপৎকালীন তহবিল তৈরি করুন।
  • মানসিক স্থিতিশীলতা: এই টাকা আপনার মস্তিষ্কের রসায়ন বদলে দেবে। আপনার যখন ১৫,০০০ ডলার নগদ জমা থাকবে, তখন আপনি অভাবের ভয়ে অস্থির সিদ্ধান্ত নেবেন না।

ধাপ ৪: জুলাই ও আগস্ট — নিজের ওপর বিনিয়োগ

১৫,০০০ ডলারের মধ্যে ১০,০০০ ডলার হাত দেবেন না। বাকি ৫,০০০ ডলার দিয়ে আপনার উপার্জনের ক্ষমতা বাড়াতে বিনিয়োগ করুন।

  • দক্ষতা বৃদ্ধি: এমন কোনো সার্টিফিকেট বা কোর্স (যেমন কোডিং, রিয়েল এস্টেট লাইসেন্স) করুন যা আপনার প্রতি ঘণ্টার আয়ের হার বাড়িয়ে দেবে।
  • প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম: আপনার কাজের জন্য ভালো ল্যাপটপ বা টুলস কিনুন যাতে আপনি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন।
  • নেটওয়ার্কিং: সফল ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ বাড়াতে বা কনফারেন্সে যেতে কিছু টাকা খরচ করুন। মাঙ্গার বলেন, বড় বড় সুযোগগুলো সঠিক মানুষের সাথে পরিচয়ের মাধ্যমেই আসে।

ধাপ ৫: সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর — পরোক্ষ আয়ের (Passive Income) পথ তৈরি

এখন যেহেতু আপনার দক্ষতা ও আয় বেড়েছে, তাই এই বাড়তি টাকা দিয়ে এমন কিছু তৈরি করুন যা আপনার ঘুমের মধ্যেও আয় দেবে।

  • ডিভিডেন্ড স্টক: সাবান বা টুথপেস্টের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস তৈরি করে এমন স্থিতিশীল কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করুন।
  • রিয়েল এস্টেট (ডুপ্লেক্স স্ট্র্যাটেজি): সাশ্রয়ী ঋণে একটি ছোট ডুপ্লেক্স বাড়ি কেনার চেষ্টা করুন। এক পাশে নিজে থাকুন এবং অন্য পাশ ভাড়া দিন, যাতে ভাড়া থেকে আপনার ঋণের কিস্তি পরিশোধ হয়ে যায়।

ধাপ ৬: নভেম্বর — শৃঙ্খলার পরীক্ষা (Discipline Test)

নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে উৎসবের কারণে মানুষ সবচেয়ে বেশি টাকা খরচ করে ফেলে। ১০ মাসের পরিশ্রম এক নিমেষে নষ্ট করবেন না।

  • খরচ নিয়ন্ত্রণ: উৎসবে অতিরিক্ত খরচ করবেন না। উপহার হিসেবে সময় বা হাতে লেখা চিঠি দিন। আপনার পরিবারকে বুঝিয়ে বলুন যে আপনি ভবিষ্যতের বড় লক্ষ্যের জন্য এখন সংযত থাকছেন।
  • টাকা ধরে রাখা: মনে রাখবেন, টাকা আয় করা আর টাকা থাকা এক কথা নয়। আপনার হাতে কত টাকা অবশিষ্ট আছে, সেটাই আসল কথা।

ধাপ ৭: ডিসেম্বর — আক্রমণাত্মক মেজাজে প্রস্তুতি

১২ মাস পর আপনি এখন নিঃস্ব নন, বরং সচ্ছল। এখন দ্বিতীয় বছরের পরিকল্পনা করার সময়।

  • ডিফেন্স থেকে অফেন্স: প্রথম বছর ছিল টিকে থাকার লড়াই (Defense)। দ্বিতীয় বছর হবে বড় ঝুঁকি নেওয়া এবং ব্যবসা শুরু করার বছর (Offense)।
  • সেরা ৫% মানুষের তালিকায়: যদি আপনি পুরো ১২ মাস এই পরিকল্পনা মেনে চলতে পারেন, তবে আপনি সেই শীর্ষ ৫% মানুষের একজন হয়ে উঠবেন যারা সত্যিই নিজেদের ভাগ্য বদলাতে পেরেছে।

শেষ কথা:

এই পরিকল্পনা ৭০ বছর ধরে কাজ করে আসছে। কিন্তু মাঙ্গার সতর্ক করেছেন যে, বেশিরভাগ মানুষ কেবল ভিডিও দেখবে বা লেখা পড়বে, কিন্তু বাস্তবে কিছু করবে না। ২০২৭ সালে যদি নিজেকে একটি সফল অবস্থানে দেখতে চান, তবে আপনাকে আজ থেকেই এই নিয়মগুলো মেনে কাজ শুরু করতে হবে।

Leave a comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।