বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সূচিত হয়েছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে “বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (পাবলিক অফার অফ ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ) রুলস, ২০২৫” জারি করেছে । এই নতুন বিধিমালাটি ২০১৫ সালের পাবলিক ইস্যু রুলসকে রহিত করে প্রণয়ন করা হয়েছে এবং এটি অবিলম্বে কার্যকর বলে গণ্য হবে । আজকের ব্লগে আমরা এই বিধিমালার প্রতিটি ধাপ, যোগ্যতা এবং পদ্ধতিগুলো কালানুক্রমিকভাবে আলোচনা করব, যা বিনিয়োগকারী এবং ইস্যুয়ার কোম্পানি উভয়ের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
Table of Contents
১. প্রাথমিক ধারণা ও সংজ্ঞা
নতুন এই বিধিমালায় পাবলিক অফারের সংজ্ঞা এবং পদ্ধতি সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। পাবলিক অফার বা পাবলিক ইস্যু বলতে ইনিশিয়াল পাবলিক অফার (IPO) অথবা রিপিট পাবলিক অফার (RPO)-এর মাধ্যমে ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ ইস্যু করাকে বোঝানো হয়েছে । এখানে দুটি মূল পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে:
১. ফিক্সড প্রাইস মেথড: যেখানে ইস্যুয়ার এবং ইস্যু ম্যানেজার মিলে শেয়ারের দাম নির্ধারণ করেন ।
২. বুক বিল্ডিং মেথড: যেখানে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের (Eligible Investors) চাহিদার ভিত্তিতে বিডিংয়ের মাধ্যমে শেয়ারের কাট-অফ প্রাইস নির্ধারিত হয় ।
এছাড়াও, নতুন বিধিতে “গ্রিন ফিল্ড কোম্পানি” বা নতুন প্রকল্পগুলোর জন্য বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে, যা আগে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করেনি ।
২. পাবলিক অফারের আবেদনের যোগ্যতা (সাধারণ শর্তাবলী)
কোনো কোম্পানি যদি পুঁজিবাজারে আসতে চায়, তবে তাকে রুল ৪(১) অনুযায়ী কিছু মৌলিক শর্ত পূরণ করতে হবে:
- কোম্পানিটিকে অবশ্যই পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হতে হবে [।
- আইপিও আবেদনের সময় কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন (Pre-IPO paid-up capital) অন্তত ৩০ কোটি টাকা হতে হবে এবং পোস্ট-আইপিও মূলধন অন্তত ৫০ কোটি টাকা হতে হবে। কোম্পানিকে তার পোস্ট-আইপিও মূলধনের অন্তত ১০% শেয়ার অফার করতে হবে ।
- স্পন্সর এবং পরিচালকদের সব সময় সম্মিলিতভাবে অন্তত ৩০% শেয়ার ধারণ করতে হবে ।
- কোম্পানিটির বিগত অর্থবছরে মুনাফা থাকতে হবে এবং কোনো পুঞ্জীভূত লোকসান থাকা যাবে না (গ্রিন ফিল্ড ও রেগুলেটেড কোম্পানি বাদে) ।
- ইস্যুয়ার বা এর ৫% বা তার বেশি শেয়ারধারী কোনো পরিচালক ঋণ খেলাপি হতে পারবেন না ।
- ইস্যুটিকে অন্তত ৩৫% আন্ডাররাইট বা অবলিখন করতে হবে [৩০]।
- আবেদনের পূর্ববর্তী ২ বছরের মধ্যে বোনাস শেয়ার ছাড়া অন্য কোনোভাবে মূলধন বৃদ্ধি করা যাবে না (তবে কমিশনের পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে কিছু শিথিলতা আছে) ।
৩. পদ্ধতিভেদে অতিরিক্ত যোগ্যতা ও শর্তাবলী
সাধারণ শর্তের পাশাপাশি কোম্পানিটি কোন পদ্ধতিতে বাজারে আসবে, তার ওপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ক) ফিক্সড প্রাইস মেথড (গ্রিন ফিল্ড ব্যতীত): এই পদ্ধতিতে শেয়ার প্রিমিয়ামে বা অভিহিত মূল্যে ছাড়া যাবে। তবে শর্ত হলো:
- পোস্ট-আইপিও মূলধন ১২৫ কোটি টাকার বেশি হতে পারবে না (রেগুলেটেড কোম্পানি বাদে) ।
- যদি প্রিমিয়ামে শেয়ার ছাড়তে চায়, তবে কোম্পানিকে অন্তত ৩ বছর বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালাতে হবে, বিগত ২ বছর মুনাফায় থাকতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে অন্তত ‘A’ ক্যাটাগরির ক্রেডিট রেটিং থাকতে হবে ।
খ) ফিক্সড প্রাইস মেথড (গ্রিন ফিল্ড কোম্পানি): নতুন বা গ্রিন ফিল্ড কোম্পানিগুলো শুধুমাত্র অভিহিত মূল্যে (Par value) বা ডিসকাউন্টে শেয়ার ছাড়তে পারবে। এদের ক্ষেত্রে:
- পোস্ট-আইপিও মূলধন ১২৫ কোটি টাকার বেশি হতে পারে ।
- স্পন্সর ও পরিচালকদের অবদান পোস্ট-আইপিও মূলধনের অন্তত ৭৫% হতে হবে এবং আইপিও-পরবর্তী ২ বছর মুনাফা না হওয়া পর্যন্ত এই শেয়ার বিক্রি করা যাবে না (Lock-in) ।
- প্রস্পেক্টাসের কভার পেজে বড় অক্ষরে ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্কবার্তা দিতে হবে যে, এটি একটি গ্রিন ফিল্ড কোম্পানি এবং এর ঝুঁকি বিদ্যমান কোম্পানিগুলোর চেয়ে বেশি।
গ) বুক বিল্ডিং মেথড: বড় মূলধনী কোম্পানিগুলোর জন্য এই পদ্ধতি প্রযোজ্য। শর্তসমূহ:
- শেয়ার শুধুমাত্র কাট-অফ প্রাইসে অফার করা যাবে ।
- কমপক্ষে ৩ বছর বাণিজ্যিক কার্যক্রম থাকতে হবে এবং বিগত ২ বছর মুনাফা ও পজিটিভ ক্যাশ ফ্লো থাকতে হবে ।
- দীর্ঘমেয়াদে অন্তত ‘A’ ক্যাটাগরির ক্রেডিট রেটিং থাকতে হবে ।
- ৫০০ কোটি টাকার বেশি মূলধনী কোম্পানি হলে তারা ১০%-এর কম (কিন্তু ৫%-এর নিচে নয়) শেয়ার অফার করতে পারবে ।
৪. অফারের আবেদন ও রোড শো প্রক্রিয়া
বুক বিল্ডিং পদ্ধতির ক্ষেত্রে কোম্পানিকে প্রথমে রোড শো (Road Show) আয়োজন করতে হবে।
- রোড শো: ইস্যুয়ার এবং ইস্যু ম্যানেজারকে রোড শো-এর অন্তত ১০ কার্যদিবস আগে বাংলা ও ইংরেজি দৈনিকে বিজ্ঞাপন দিয়ে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের (EIs) আমন্ত্রণ জানাতে হবে । রোড শো-তে রেড-হেরিং প্রস্পেক্টাস এবং ভ্যালুয়েশন মেথড (Annexure-C অনুযায়ী) উপস্থাপন করতে হবে ।
- ইন্ডিকেটিভ প্রাইস: রোড শো শেষে ইআই-দের মতামতের ভিত্তিতে ইস্যু ম্যানেজার ‘ইন্ডিকেটিভ প্রাইস’ বা নির্দেশক মূল্য নির্ধারণ করবেন। এই মূল্যটি অন্তত ৪০ জন ইআই-এর ভ্যালুয়েশনের ভিত্তিতে হতে হবে এবং ৪টি ভিন্ন ভ্যালুয়েশন মেথড দ্বারা সমর্থিত হতে হবে ।
এরপর কোম্পানি বিএসইসি এবং স্টক এক্সচেঞ্জে আবেদন জমা দেবে। স্টক এক্সচেঞ্জ আবেদন পাওয়ার ২০ দিনের মধ্যে কোম্পানির ফ্যাক্টরি বা অফিস পরিদর্শন করবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে তাদের মতামত কমিশনে জানাবে ।
৫. বিডিং এবং কাট-অফ প্রাইস নির্ধারণ (বুক বিল্ডিং)
কমিশনের অনুমোদনের পর বুক বিল্ডিং পদ্ধতির মূল ধাপ হলো বিডিং।
- বিডিং ৭২ ঘণ্টা ধরে চলবে এবং এটি স্টক এক্সচেঞ্জের ইলেকট্রনিক সাবস্ক্রিপশন সিস্টেম (ESS) এর মাধ্যমে হবে ।
- বিডাররা ইন্ডিকেটিভ প্রাইসের ২৫% কম বা বেশির মধ্যে (Price Band) বিড করতে পারবেন ।
- কোনো বিডার মোট ইআই কোটার ১%-এর বেশি শেয়ারের জন্য বিড করতে পারবেন না ।
- কার্টেল নিষিদ্ধ: বিডিং প্রক্রিয়ায় কোনো প্রকার কার্টেল বা যোগসাজশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। যদি বিডিংয়ের সময় অস্বাভাবিক মূল্য বা প্যাটার্ন লক্ষ্য করা যায়, তবে কমিশন বিডিং বাতিলসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে ৫ বছরের জন্য নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে ।
- বিডিং শেষে কাট-অফ প্রাইস নির্ধারিত হবে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্যও এই কাট-অফ প্রাইসে শেয়ার অফার করা হবে ।
৬. সাবস্ক্রিপশন ও শেয়ার বণ্টন (Distribution)
আইপিও-তে বিভিন্ন ক্যাটাগরির বিনিয়োগকারীদের জন্য কোটা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ফিক্সড প্রাইস মেথডে বণ্টন [১০৩]:
- যোগ্য বিনিয়োগকারী (EIs): ১০%
- মিউচুয়াল ফান্ড: ১০%
- ইস্যুবারের স্থায়ী কর্মচারী: ৫%
- উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তি (HNI): ৫%
- প্রবাসী বাংলাদেশি (NRB): ১০%
- সাধারণ বিনিয়োগকারী (General Investors): ৬০%
বুক বিল্ডিং মেথডে বণ্টন [১০৪]:
- যোগ্য বিনিয়োগকারী (EIs): ৪০%
- মিউচুয়াল ফান্ড: ১০%
- ইস্যুবারের স্থায়ী কর্মচারী: ৩%
- উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তি (HNI): ৫%
- প্রবাসী বাংলাদেশি (NRB): ৭%
- সাধারণ বিনিয়োগকারী (General Investors): ৩৫%
সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সাবস্ক্রিপশন প্রস্পেক্টাসের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ প্রকাশের ১০ কার্যদিবস পর শুরু হবে এবং ১৫ কার্যদিবস পর্যন্ত খোলা থাকবে। অতিরিক্ত আবেদন জমা পড়লে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে লটারির মাধ্যমে এবং অন্যদের ক্ষেত্রে প্রো-রাটা (Pro-rata) ভিত্তিতে শেয়ার বরাদ্দ দেওয়া হবে ।
৭. লক-ইন পিরিয়ড (Lock-in)
শেয়ার বাজারে লেনদেন শুরুর দিন থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শেয়ার বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা বা লক-ইন প্রযোজ্য হবে ।
- স্পন্সর ও পরিচালক: ৩ বছর ।
- প্লেসমেন্ট শেয়ারহোল্ডার (৩ বছরের কম সময় ধরে ধারণকৃত): ১ বছর ।
- অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড ও বিদেশি বিনিয়োগকারী: ১ বছর ।
- বুক বিল্ডিংয়ে ইআই-দের শেয়ার: এদের শেয়ার ধাপে ধাপে মুক্ত হবে—৫০% শেয়ার ৯০ দিনে, ২৫% শেয়ার ১২০ দিনে এবং বাকি ২৫% শেয়ার ১৮০ দিনে বিক্রি করা যাবে ।
- স্ট্র্যাটেজিক ইনভেস্টর: ২ বছর ।
৮. ফি এবং খরচ
পাবলিক অফারের জন্য ইস্যুয়ারকে বিভিন্ন ফি প্রদান করতে হবে:
- ইস্যু ম্যানেজমেন্ট ফি: ফিক্সড প্রাইসে সর্বোচ্চ ১% বা ২৫ লাখ টাকা (যেটি বেশি) এবং বুক বিল্ডিংয়ে ১% বা ৩০ লাখ টাকা ।
- আন্ডাররাইটিং ফি: অফারকৃত অংশের ৩৫%-এর ওপর সর্বোচ্চ ০.৫% ।
- কমিশন ফি: আবেদনের জন্য ৫০,০০০ টাকা (অফেরৎযোগ্য) এবং কনসেন্ট ফি হিসেবে পাবলিক অফার অ্যামাউন্টের ০.৩০% ।
৯. প্রসপেক্টাস ও তথ্যের স্বচ্ছতা
নতুন রুলে প্রসপেক্টাসে তথ্যের স্বচ্ছতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অ্যানেক্সার-এইচ (Annexure-H) অনুযায়ী প্রসপেক্টাসে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, ঝুঁকির কারণ (Risk Factors), এবং ভ্যালুয়েশন রিপোর্ট বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করতে হবে । মিথ্যা তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে কমিশন সিকিউরিটিজ অধ্যাদেশ, ১৯৬৯ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে । বিশেষত, কোম্পানির আর্থিক বিবরণী আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (IFRS/IAS) অনুযায়ী প্রস্তুত এবং নিরীক্ষিত হতে হবে ।
১০. রিপিট পাবলিক অফার (RPO)
কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি যদি পুনরায় মূলধন সংগ্রহ করতে চায়, তবে তাদের রিপিট পাবলিক অফার বা RPO-এর মাধ্যমে আসতে হবে। এর জন্য কিছু বিশেষ শর্ত রয়েছে, যেমন—পূর্ববর্তী ফান্ডের ৯০% ব্যবহার সম্পন্ন হতে হবে এবং কোম্পানিকে ইনভেস্টমেন্ট গ্রেড রেটিংধারী হতে হবে ।
উপসংহার
“বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (পাবলিক অফার অফ ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ) রুলস, ২০২৫” একটি যুগোপযোগী এবং বিস্তারিত নির্দেশিকা। এতে গ্রিন ফিল্ড কোম্পানিগুলোর জন্য যেমন সুযোগ রাখা হয়েছে, তেমনি বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে কার্টেল রোধে কঠোর ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় লক-ইন পিরিয়ড এবং তথ্যের স্বচ্ছতার বিষয়গুলো অত্যন্ত সুচিন্তিত। আশা করা যায়, এই নতুন বিধিমালার সঠিক প্রয়োগ বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে আরও গতিশীল এবং স্বচ্ছ করে তুলবে।
দ্রষ্টব্য: এই ব্লগের সকল তথ্য বিএসইসি কর্তৃক প্রকাশিত গেজেট থেকে সংগৃহীত। বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মূল গেজেটটি বিস্তারিত পড়ে নেওয়া এবং নিজস্ব বিচার-বুদ্ধি প্রয়োগ করা বাঞ্ছনীয়।