বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) মিউচ্যুয়াল ফান্ড ব্যবস্থাপনাকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং আধুনিক করার লক্ষ্যে “বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মিউচ্যুয়াল ফান্ড) বিধিমালা, ২০২৫” জারি করেছে। ১২ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত এই বিধিমালাটি ২০০১ সালের বিধিমালার স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। এই ব্লগ পোস্টে আমরা বিধিমালার তথ্যসমূহ বিস্তারিত আলোচনা করব।
Table of Contents
প্রারম্ভিক ও সংজ্ঞাসমূহ
বিধিমালার শুরুতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষার সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে যা ফান্ড পরিচালনার জন্য অপরিহার্য।
- উদ্যোক্তা (Sponsor): যিনি বা যে প্রতিষ্ঠান মিউচ্যুয়াল ফান্ড গঠন করেন। এর মধ্যে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা কোম্পানি বা কমিশনের অনুমোদনপ্রাপ্ত অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
- সম্পদ ব্যবস্থাপক (Asset Manager): যিনি মিউচ্যুয়াল ফান্ডের সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং বিনিয়োগের দায়িত্বে থাকেন।
- ট্রাস্টি (Trustee): যিনি ইউনিট হোল্ডারদের স্বার্থ সংরক্ষণে ফান্ডের সম্পদের জিম্মাদার হিসেবে কাজ করেন।
- হেফাজতকারী (Custodian): যিনি ফান্ডের সিকিউরিটিজ বা সম্পদ নিরাপদে সংরক্ষণ করেন।
- স্কিম: এটি হলো ফান্ডের অধীনে গঠিত নির্দিষ্ট বিনিয়োগ পরিকল্পনা, যা বে-মেয়াদি (Open-end) বা মেয়াদি (Closed-end) হতে পারে,।
মিউচ্যুয়াল ফান্ড নিবন্ধন প্রক্রিয়া
কোনো মিউচ্যুয়াল ফান্ড গঠন করতে হলে কমিশনের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক।
- নিবন্ধন ফি: ফান্ড নিবন্ধনের জন্য আবেদন ফি ১ লক্ষ টাকা (অফেরৎযোগ্য) এবং নিবন্ধন ফি হিসেবে ফান্ডের আকারের ০.১০% (তবে সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ টাকা) জমা দিতে হবে,।
- মেয়াদ: নিবন্ধনের মেয়াদ সনদ ইস্যু করার তারিখ হতে ৫ বছর পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
- বাতিল হওয়ার কারণ: ট্রাস্টি, সম্পদ ব্যবস্থাপক বা কাস্টোডিয়ান যদি যোগ্য না হন বা বিধিমালার শর্ত পূরণ না করেন, তবে ফান্ড নিবন্ধন বাতিল হতে পারে।
ট্রাস্টি সম্পর্কিত বিধান
ফান্ডের সুরক্ষায় ট্রাস্টির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিধিমালার তৃতীয় অধ্যায়ে ট্রাস্টি সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হয়েছে।
- যোগ্যতা ও মূলধন: ট্রাস্টি হিসেবে নিবন্ধিত হতে হলে কোনো পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থার ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ১০ কোটি টাকা হতে হবে।
- জনবল: ট্রাস্টির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কমপক্ষে ৫ বছরের এবং কমপ্লায়েন্স অফিসারের ৩ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে,।
- দায়িত্ব: ট্রাস্টি ফান্ডের সম্পদের আইনি মালিক হিসেবে কাজ করবেন এবং ইউনিট হোল্ডারদের পক্ষে বিশ্বস্ত জিম্মাদার (Fiduciary) হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। ট্রাস্টি বছরে অন্তত একটি প্রতিবেদন দাখিল করবেন যেখানে ফান্ডের কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত থাকবে।
সম্পদ ব্যবস্থাপক (Asset Manager)
চতুর্থ অধ্যায়ে সম্পদ ব্যবস্থাপকের যোগ্যতা ও দায়িত্ব বর্ণনা করা হয়েছে।
- যোগ্যতা: সম্পদ ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করার জন্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ন্যূনতম ১০ কোটি টাকা হতে হবে। তাদের পরিচালনা পর্ষদে অন্তত একজন স্বতন্ত্র পরিচালক থাকতে হবে।
- বিনিয়োগ কমিটি: সম্পদ ব্যবস্থাপককে একটি বিনিয়োগ কমিটি গঠন করতে হবে, যার সদস্যদের অন্তত ৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
- নিষিদ্ধ কার্যক্রম: সম্পদ ব্যবস্থাপক নিজের বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের স্বার্থে ফান্ডের সম্পদ ব্যবহার করতে পারবেন না এবং কোনো গ্যারান্টি প্রদান করতে পারবেন না।
হেফাজতকারী (Custodian)
পঞ্চম অধ্যায়ে কাস্টোডিয়ানের বিধানাবলী রয়েছে।
- যোগ্যতা: কাস্টোডিয়ান হিসেবে নিবন্ধনের জন্য ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ২০ কোটি টাকা হতে হবে।
- দায়িত্ব: কাস্টোডিয়ান ফান্ডের সকল সিকিউরিটিজ, নগদ অর্থ এবং স্বর্ণ বা অন্যান্য সম্পদ নিরাপদে সংরক্ষণ করবেন। সকল ডিমেটেরিয়ালাইজড (ইলেকট্রনিক) শেয়ার সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বা ডিপি-র মাধ্যমে সংরক্ষণ করতে হবে।
স্কিম গঠন ও পরিচালনা
মিউচ্যুয়াল ফান্ডের অধীনে বিভিন্ন স্কিম বা বিনিয়োগ পরিকল্পনা কীভাবে গঠিত হবে, তা ষষ্ঠ অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে।
- বে-মেয়াদি ফান্ড (Open-end Fund): বে-মেয়াদি ফান্ডের প্রাথমিক আকার ৫০ কোটি টাকার কম হতে পারবে না। এর মধ্যে উদ্যোক্তাকে কমপক্ষে ১০% মূলধন (যা ৫০ কোটি টাকার ফান্ডের ক্ষেত্রে ৫ কোটি টাকা) সরবরাহ করতে হবে।
- মেয়াদি ফান্ড (Closed-end Fund): নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো মেয়াদি বা ক্লোজড-এন্ড ফান্ড ১০ বছরের বেশি মেয়াদের জন্য গঠন করা যাবে না।
- লক-ইন পিরিয়ড: উদ্যোক্তার অংশের মূলধন স্কিম চালুর তারিখ থেকে ১ বছর পর্যন্ত লক-ইন থাকবে (হস্তান্তর করা যাবে না)।
বিনিয়োগ নির্দেশিকা ও সীমাবদ্ধতা
বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি কমানোর জন্য সপ্তম অধ্যায়ে বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
- বিনিয়োগের ক্ষেত্র: তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ, আইপিও, বা কমিশনের অনুমোদিত অন্যান্য ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা যাবে।
- বিনিয়োগ সীমা (Exposure Limits):
- কোনো একক কোম্পানি বা স্কিমে ফান্ডের আকারের ১০% এর বেশি বিনিয়োগ করা যাবে না।
- একই গ্রুপের অধিভুক্ত কোম্পানিগুলোতে সব মিলিয়ে ফান্ডের আকারের ২৫% এর বেশি বিনিয়োগ করা যাবে না।
- ফান্ডের নিজস্ব কোনো শেয়ার বা ইউনিটে বিনিয়োগ করা যাবে না।
- ঋণ প্রদান ও গ্রহণ: মিউচ্যুয়াল ফান্ড কাউকে ঋণ দিতে পারবে না এবং বিনিয়োগের জন্য নিজেও কোনো ঋণ নিতে পারবে না,।
ফি এবং ব্যয়সীমা
ফান্ড পরিচালনার খরচ নিয়ন্ত্রণের জন্য অষ্টম অধ্যায়ে ব্যয়ের সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
- ব্যবস্থাপনা ফি (Management Fee): ফান্ডের সাপ্তাহিক গড় নিট সম্পদ মূল্যের (NAV) ওপর ভিত্তি করে সম্পদ ব্যবস্থাপক বার্ষিক ফি পাবেন। এর হার নিম্নরূপ:
- ১ম ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত: ২.৫০%
- পরবর্তী ৫ কোটি থেকে ২৫ কোটি পর্যন্ত: ১.৫০%
- পরবর্তী ২৫ কোটি থেকে ৫০ কোটি পর্যন্ত: ১.২৫%
- পরবর্তী ৫০ কোটি টাকার উপরে: ১.০০%
- প্রারম্ভিক ব্যয়: স্কিম গঠনের প্রারম্ভিক ব্যয় ফান্ডের আকারের ১% বা ৫০ লক্ষ টাকার বেশি হতে পারবে না। এই ব্যয় ৫ থেকে ৭ বছরের মধ্যে অবলোপন (amortize) করতে হবে।
মূল্য নির্ধারণ, লভ্যাংশ ও হিসাব রক্ষণ
নবম অধ্যায়ে ফান্ডের সম্পদের মূল্য নির্ধারণ এবং লভ্যাংশ বন্টনের নিয়ম বলা হয়েছে।
- নিট সম্পদ মূল্য (NAV): আন্তর্জাতিক হিসাব মান (IFRS/IAS) অনুযায়ী সম্পদের বাজার মূল্য বা ফেয়ার ভ্যালু পদ্ধতিতে NAV নির্ধারণ করতে হবে,।
- লভ্যাংশ (Dividend):
- ফান্ডের অর্জিত মুনাফা থেকে লভ্যাংশ ঘোষণা করা যাবে।
- বে-মেয়াদি ফান্ডের ক্ষেত্রে লভ্যাংশ হিসেবে সাধারণত নগদ অর্থ (Cash Dividend) দিতে হবে। তবে কিউমুলেটিভ ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান (CIP) বা পুনঃবিনিয়োগের সুযোগ থাকলে ইউনিট ইস্যু করা যেতে পারে।
- মেয়াদি ফান্ডের ক্ষেত্রে লভ্যাংশ নগদে প্রদান করতে হবে।
- রিজার্ভ: লভ্যাংশ সমতা তহবিলের জন্য কোনো প্রভিশন রাখা যাবে না যা ১.৫% এর বেশি।
আর্থিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষা
স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দশম অধ্যায়ে নিরীক্ষা ও প্রতিবেদনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
- নিরীক্ষক নিয়োগ: ট্রাস্টি ফান্ডের জন্য অডিটর নিয়োগ করবেন। সম্পদ ব্যবস্থাপক বা ট্রাস্টির সাথে সম্পর্কিত কেউ অডিটর হতে পারবেন না।
- প্রতিবেদন প্রকাশ: প্রতি ত্রৈমাসিক এবং বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করে কমিশন এবং ইউনিট হোল্ডারদের জানাতে হবে। বার্ষিক প্রতিবেদন হিসাব বছর শেষ হওয়ার ৩ মাসের মধ্যে প্রকাশ করতে হবে,।
আচরণবিধি (Code of Conduct)
বিধিমালার একাদশ অধ্যায় এবং তফসিলগুলোতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আচরণের মানদণ্ড ঠিক করে দেওয়া হয়েছে।
- স্বার্থের সংঘাত: ট্রাস্টি, সম্পদ ব্যবস্থাপক বা কাস্টোডিয়ান এমন কোনো কাজ করবেন না যা ইউনিট হোল্ডারদের স্বার্থের পরিপন্থী বা নিজেদের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত তৈরি করে,।
- তথ্য প্রকাশ: ফান্ডের মূল্য সংবেদনশীল তথ্য গোপন করা যাবে না এবং বিভ্রান্তিকর কোনো তথ্য প্রচার করা যাবে না।
স্কিম একত্রীকরণ ও বিলুপ্তি
- একত্রীকরণ (Merger): বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে ট্রাস্টি ও সম্পদ ব্যবস্থাপক চাইলে কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে একাধিক স্কিমকে একত্রীকরণ করতে পারেন।
- বিলুপ্তি (Winding Up): যদি ফান্ডের আকার নূন্যতম মূলধনের (বে-মেয়াদি ফান্ডের ক্ষেত্রে ২৫ কোটি টাকা) নিচে নেমে যায় অথবা ৭৫% ইউনিট হোল্ডার দাবি করেন, তবে স্কিমটি বিলুপ্ত বা উইন্ড-আপ করতে হবে।
উপসংহার
“বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মিউচ্যুয়াল ফান্ড) বিধিমালা, ২০২৫” একটি যুগোপযোগী পদক্ষেপ। এতে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা, ফান্ডের স্বচ্ছতা এবং সম্পদ ব্যবস্থাপকদের জবাবদিহিতার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বিশেষ করে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের বাধ্যবাধকতা, বিনিয়োগের সীমা নির্ধারণ এবং কঠোর অডিট ব্যবস্থা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়। যারা মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী, তাদের জন্য এই বিধিমালার খুঁটিনাটি জানা অত্যন্ত জরুরি।
দ্রষ্টব্য: এই ব্লগ পোস্টটি mutual fund 2025 থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। বিস্তারিত জানার জন্য মূল গেজেটটি দেখা যেতে পারে।