বাংলাদেশে বিলিয়ন ডলার ক্লাবের শিল্প গ্রুপ কারা?

বাংলাদেশের শিল্প খাতের ইতিহাসে ২০২৪-২৫ অর্থবছর এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এই সময়ে দেশের উৎপাদনমুখী শিল্পে এক বিশাল পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়েছে। বিশেষ করে আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন নতুন রেকর্ডের দেখা মিলেছে। আজকের এই দীর্ঘ প্রবন্ধে আমরা আলোচনা করব সেই সব শিল্প গ্রুপ নিয়ে, যারা তাদের ব্যবসায়িক দক্ষতা এবং বিশাল বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিলিয়ন ডলার ক্লাবে স্থান করে নিয়েছে।

বিলিয়ন ডলার ক্লাব

বানিজ্যিক ও অর্থনৈতিক ভাষায় বিলিয়ন ডলার ক্লাব বলতে এমন সব শিল্প প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপকে বোঝানো হয় যাদের বার্ষিক আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যের মোট পরিমাণ ১০০ কোটি মার্কিন ডলার বা তার বেশি। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি অত্যন্ত গৌরবের বিষয় যে, এখন দেশি ও বিদেশি মিলিয়ে মোট আটটি শিল্প গ্রুপ এই মর্যাদাপূর্ণ তালিকায় নিজেদের নাম লেখাতে সক্ষম হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, দেশের মোট আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ১১ শতাংশ নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এই আটটি গ্রুপের মাধ্যমে। যা অংকে ১ হাজার ২৫৪ কোটি মার্কিন ডলারের সমান।

এই আটটি শিল্প গ্রুপ শুধুমাত্র বাণিজ্যের দিক থেকেই এগিয়ে নেই, বরং দেশের জাতীয় রাজস্ব ভাণ্ডারেও তাদের অবদান অনস্বীকার্য। গত অর্থবছরে এই প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারকে প্রায় ১৭ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা রাজস্ব প্রদান করেছে। এছাড়া দেশের বেকারত্ব দূরীকরণে এদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে এই আটটি শিল্প গ্রুপে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় সোয়া পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

আসুন বিস্তারিতভাবে জেনে নেই এই বিলিয়ন ডলার ক্লাবের সদস্য এবং তাদের ব্যবসায়িক অগ্রযাত্রা সম্পর্কে।

এক. মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ বা এমজিআই

বাংলাদেশের শিল্প খাতের এক অবিসংবাদিত নেতা হলো মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ। প্রায় ৫০ বছর আগে মোস্তফা কামালের হাত ধরে এই গ্রুপের যাত্রা শুরু হয়েছিল। বর্তমানে তারা বিলিয়ন ডলার ক্লাবের শীর্ষে অবস্থান করছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তাদের মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮৩ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৩ শতাংশ বেশি।

এমজিআই-এর এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে তাদের নিরন্তর বিনিয়োগ এবং নতুন নতুন শিল্প কারখানা গড়ে তোলার মানসিকতা। তারা মূলত শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বিশাল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে। গত অর্থবছরে তাদের মোট আমদানির পরিমাণ ছিল ২৭৫ কোটি ডলার এবং রপ্তানি ছিল প্রায় ১৩ কোটি ডলার। ফ্রেশ ব্র্যান্ডের মাধ্যমে তারা দেশের সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত পরিচিত। বর্তমানে এই গ্রুপটি সমুদ্রগামী জাহাজ, হেলিকপ্টার সার্ভিস, ইস্পাত পণ্য বা রড এবং কাচ কারখানার মতো ভারী শিল্পে তাদের বিনিয়োগ সম্প্রসারিত করেছে। প্রায় ৬৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান নিয়ে এমজিআই দেশের অর্থনীতিতে এক বিশাল স্তম্ভ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

দুই. প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ

তালিকায় দুই ধাপ এগিয়ে বর্তমানে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। আহসান খান চৌধুরীর নেতৃত্বে এই গ্রুপটি ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে ১৯০ কোটি ডলারের লেনদেনে পৌঁছেছে। তারা মূলত বহুমুখী পণ্য উৎপাদন এবং রপ্তানিতে বিশেষ পারদর্শিতা দেখিয়েছে। বর্তমানে তাদের রপ্তানি তালিকায় প্রায় দেড় হাজার পণ্য রয়েছে এবং তারা বিশ্বের ১৪৮টি দেশে নিজেদের পণ্য পৌঁছে দিচ্ছে।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো তারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিল্পায়ন করতে পছন্দ করে। রাজশাহী, রংপুর, বগুড়া, খুলনা, যশোর ও ভোলার মতো জেলাগুলোতে তারা কারখানা স্থাপন করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করছে। বর্তমানে এই গ্রুপে ১ লাখ ৬৭ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে, যা দেশের যেকোনো একক শিল্প গ্রুপের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ।

তিন. আবুল খায়ের গ্রুপ

ভারী শিল্পের কথা বললে প্রথমেই চলে আসে আবুল খায়ের গ্রুপের নাম। ১৯৫৩ সালে আবুল খায়েরের হাত ধরে শুরু হওয়া এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে রড, সিমেন্ট এবং ঢেউটিন উৎপাদনে দেশের শীর্ষস্থানে রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তাদের মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১৬৮ কোটি ডলার। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে তাদের ইস্পাত কারখানার উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে এখন ৩০ লাখ টনে উন্নীত করা হয়েছে।

রড ছাড়াও তারা গুঁড়া দুধের বাজারে ১ নম্বরে এবং চা ও টোব্যাকো ব্যবসায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। গত অর্থবছরে তারা সরকারকে ৩ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা রাজস্ব দিয়েছে। বর্তমানে তাদের অধীনে ৪০টি শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেখানে ৫৫ হাজার মানুষ কাজ করছে।

চার. ইয়াংওয়ান করপোরেশন

বিলিয়ন ডলার ক্লাবে জায়গা করে নেওয়া একমাত্র বিদেশি শিল্প গ্রুপ হলো দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়াংওয়ান করপোরেশন। কিহাক সাংয়ের মালিকানাধীন এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত শতভাগ রপ্তানিনির্ভর পণ্য উৎপাদন করে। গত অর্থবছরে তারা ৯৭ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। বাংলাদেশে তাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল চট্টগ্রাম থেকে এবং তারা আনোয়ারায় দেশের প্রথম বেসরকারি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল বা কোরিয়ান ইপিজেড স্থাপন করেছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে মিলিয়ে তাদের কারখানায় ৭৩ হাজারেরও বেশি মানুষ কর্মরত আছে।

পাঁচ. সিটি গ্রুপ

ভোক্তাপণ্য বা ভোগ্যপণ্যের বাজারে সিটি গ্রুপ এক অতি পরিচিত নাম। ১৯৭২ সালে ফজলুর রহমানের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই গ্রুপটির বর্তমান অবস্থান পঞ্চম। তাদের প্রধান ব্র্যান্ড হলো তীর। গত অর্থবছরে তাদের লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১২৯ কোটি ডলার। যদিও আগের বছরের তুলনায় তাদের লেনদেন কিছুটা কমেছে, তবে তারা এখন বহুমুখী বিনিয়োগে মনোযোগ দিচ্ছে। তারা কাগজ, এলপিজি, সিমেন্ট, কাজুবাদাম এবং চা-বাগানের মতো নতুন নতুন খাতে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছে।

ছয়. স্কয়ার গ্রুপ

বাংলাদেশের কর্পোরেট সংস্কৃতি এবং ওষুধ শিল্পে স্কয়ার গ্রুপ একটি অনুকরণীয় নাম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে তারা ষষ্ঠ অবস্থানে উঠে এসেছে। তাদের মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১২০ কোটি ডলার। স্কয়ার মূলত ওষুধ, তৈরি পোশাক, প্রসাধন এবং খাদ্যপণ্য নিয়ে কাজ করে। তপন চৌধুরীর নেতৃত্বে এই গ্রুপটি একটি পরিবারের মতো পরিচালিত হয় এবং তাদের প্রতিষ্ঠানে ৮০ হাজারের বেশি মানুষ কাজ করে। তাদের রপ্তানির একটি বড় অংশই হলো তৈরি পোশাক।

সাত. টি কে গ্রুপ

মোহাম্মদ আবু তৈয়ব এবং মোহাম্মদ আবুল কালাম দুই ভাইয়ের হাত ধরে শুরু হওয়া টি কে গ্রুপ তাদের অবস্থান ধরে রেখেছে। গত অর্থবছরে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে তাদের লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ১১৫ কোটি ডলার। তারা মূলত ভোজ্যতেল এবং ঢেউটিনের কাঁচামাল আমদানিতে বড় ভূমিকা পালন করে। তাদের রপ্তানি তালিকায় রয়েছে খাদ্যপণ্য, জুতা, সুতা এবং রাসায়নিক। বর্তমানে ৫০ হাজার মানুষ এই গ্রুপে কর্মরত আছেন।

আট. বিএসআরএম গ্রুপ

ইস্পাত শিল্পের জায়ান্ট বিএসআরএম গ্রুপ মূলত এক খাতেই তাদের বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ধরে রেখেছে। ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই গ্রুপটি এখন তাদের তৃতীয় প্রজন্মের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। গত অর্থবছরে তারা ১০২ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, যার সিংহভাগই ছিল লোহার কাঁচামাল। বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দাম কমার কারণে তাদের লেনদেনের অংক কিছুটা কমলেও তারা এখনো দেশের নির্মাণ শিল্পের অন্যতম প্রধান যোগানদাতা।

তালিকায় বড় পরিবর্তন ও ছিটকে যাওয়া গ্রুপ

২০২৪-২৫ অর্থবছরের এই তালিকায় সবচেয়ে বড় চমক ছিল বসুন্ধরা গ্রুপের ছিটকে যাওয়া। আগের অর্থবছরে তারা ১১২ কোটি ডলারের লেনদেন করে এই তালিকায় থাকলেও সর্বশেষ অর্থবছরে তাদের লেনদেন কমে ৫১ কোটি ডলারে নেমেছে। মূলত ভোগ্যপণ্য এবং সিমেন্টের কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়ায় তারা এই তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এছাড়া নানা অনিয়মের অভিযোগে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অনুসন্ধান শুরু হওয়াকেও এর একটি কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

শিল্প খাতের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

দেশের শীর্ষ এই শিল্প গ্রুপগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একটি মজবুত ভিত্তি প্রদান করেছে। তবে তাদের চলার পথ সব সময় মসৃণ নয়। বিশ্লেষকদের মতে, শিল্পায়নের মূল ভিত্তি হলো অভ্যন্তরীণ চাহিদা। বাংলাদেশের বিশাল জনসংখ্যার চাহিদাকে কেন্দ্র করেই এই গ্রুপগুলো বড় হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে তাদের আরও সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের রপ্তানি বাণিজ্য আরও বাড়াতে হলে অবকাঠামো খাতের উন্নয়ন জরুরি। বিশেষ করে বন্দর ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং লিড টাইম বা পণ্য পাঠানোর সময় কমিয়ে আনা প্রয়োজন। এছাড়া নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে এবং আইনের শাসন বজায় থাকলে এই গ্রুপগুলো দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।

সমাপ্তি

পরিশেষে বলা যায়, বিলিয়ন ডলার ক্লাবে থাকা এই আটটি শিল্প গ্রুপ বাংলাদেশের গর্ব। তাদের এই অগ্রযাত্রা প্রমাণ করে যে, সঠিক পরিকল্পনা এবং কঠোর পরিশ্রম থাকলে বাংলাদেশের বেসরকারি খাত বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। আগামী দিনগুলোতে আরও নতুন নতুন গ্রুপ এই তালিকায় যুক্ত হবে এবং দেশের অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

Leave a comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।