বাংলাদেশের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নকে আরও গতিশীল করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২,৫০০ কোটি টাকার একটি নতুন সরকারি সুকুক বন্ড ইস্যু করতে যাচ্ছে। এটি বাংলাদেশের সপ্তম সরকারি বিনিয়োগ সুকুক, যার মাধ্যমে নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর জেলার পল্লী অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন করা হবে। শরীয়াহ-সম্মত কাঠামোর আওতায় পরিচালিত এই বিনিয়োগ উদ্যোগটি একদিকে যেমন নিরাপদ মুনাফার সুযোগ দিচ্ছে, অন্যদিকে দেশের টেকসই উন্নয়নেও ভূমিকা রাখছে।
Table of Contents
প্রকল্পের নাম ও মূল উদ্দেশ্য
এই সুকুকটির নাম ‘IRIDPNFL আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সুকুক’। এর মূল লক্ষ্য হলো নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর জেলার গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থসংস্থান নিশ্চিত করা। এই প্রকল্পের আওতায় গ্রামীণ রাস্তাঘাট, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর উন্নয়ন করা হবে, যা সরাসরি ওই অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতিতে সহায়ক হবে।
গ্রামীণ অবকাঠামো শক্তিশালী হলে স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি আসে, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়। সেই লক্ষ্যেই এই সুকুকের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সুকুকের মেয়াদ ও মুনাফার কাঠামো
এই সুকুক বন্ডটি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী ও নির্ভরযোগ্য সঞ্চয় মাধ্যম হিসেবে ডিজাইন করা হয়েছে।
- মেয়াদ: সুকুকটির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ বছর। এর মেয়াদ শেষ হবে ৯ ফেব্রুয়ারি ২০৩৩ সালে।
- মুনাফার হার: বিনিয়োগের বিপরীতে বার্ষিক ৯.৬০ শতাংশ হারে মুনাফা প্রদান করা হবে।
- মুনাফা প্রদান পদ্ধতি: বিনিয়োগকারীরা প্রতি ছয় মাস অন্তর লভ্যাংশ বা ভাড়াভিত্তিক আয় পাবেন।
- মোট লভ্যাংশ: সাত বছর মেয়াদে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মোট ১,৬৮০ কোটি টাকা মুনাফা বিতরণ করা হবে।
এই কাঠামো বিনিয়োগকারীদের জন্য নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।
শরীয়াহ-সম্মত বিনিয়োগ কাঠামো
এই সুকুকটি সম্পূর্ণভাবে ইজারা বা ভাড়াভিত্তিক শরীয়াহ কাঠামোতে ইস্যু করা হচ্ছে। অর্থাৎ, সুকুকের বিপরীতে বাস্তব সম্পদের ব্যবহার থেকে অর্জিত ভাড়া বা আয় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মুনাফা হিসেবে বিতরণ করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের শরীয়াহ অ্যাডভাইজরি কমিটি সুকুকটির প্রসপেক্টাস এবং শরীয়াহ কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেট যাচাই করে অনুমোদন দিয়েছে। ফলে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগ মাধ্যম।
কারা এই সুকুকে বিনিয়োগ করতে পারবেন
এই সুকুক নিলামে অংশগ্রহণের সুযোগ বিস্তৃত পরিসরে রাখা হয়েছে।
সরাসরি অংশগ্রহণকারী:
- বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে কারেন্ট বা আল-ওয়াদিয়া হিসাব রয়েছে এমন সকল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান।
পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণকারী (ব্যাংকের মাধ্যমে):
- সাধারণ ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারী (দেশি ও প্রবাসী বাংলাদেশি)
- দেশি ও বিদেশি কর্পোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী
- বীমা কোম্পানি ও ইনভেস্টমেন্ট প্রতিষ্ঠান
- প্রভিডেন্ট ফান্ড ও ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স ফান্ড
ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের নিজ নিজ ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিলামে অংশ নিতে হবে।
নিলামের সময়সূচি ও আবেদনের নিয়ম
এই সুকুকে বিনিয়োগ করতে আগ্রহীদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
- ন্যূনতম বিনিয়োগ: ১০,০০০ টাকা বা এর গুণিতক।
- বিড দাখিলের সময়: ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সকাল ১০:০০টা থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ দুপুর ১২:৩০টা পর্যন্ত।
- নিলামের স্থান: বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিলস্থ প্রধান কার্যালয়।
- ফলাফল ঘোষণা: নিলাম সম্পন্ন হওয়ার দিনই সফল আবেদনকারীদের ই-মেইলের মাধ্যমে বরাদ্দের তথ্য জানানো হবে।
কেন এই সুকুক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ
এই সুকুক কেবল একটি আর্থিক পণ্য নয়; এটি দেশের উন্নয়ন যাত্রার একটি অংশ। এর মাধ্যমে—
- গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে
- সরকারি গ্যারান্টিতে নিরাপদ বিনিয়োগের সুযোগ মিলবে
- শরীয়াহ-সম্মত নিয়মে নিয়মিত মুনাফা অর্জন সম্ভব হবে
- দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল বিনিয়োগ নিশ্চিত হবে
উপসংহার
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২,৫০০ কোটি টাকার সপ্তম সুকুক বন্ড একটি সময়োপযোগী ও বহুমাত্রিক উদ্যোগ। যারা শরীয়াহ-সম্মত, নিরাপদ এবং উন্নয়নমুখী বিনিয়োগ খুঁজছেন, তাদের জন্য এটি একটি অনন্য সুযোগ। একই সঙ্গে এই বিনিয়োগ নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর অঞ্চলের গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জীবনমান উন্নয়নে শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে।